ইউক্রেন যুদ্ধ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা- মহসিন মুন্সী( লেখক ও কলামিস্ট)

ইউক্রেন যুদ্ধ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা- মহসিন মুন্সী( লেখক ও কলামিস্ট)

মহসিন মুন্সী:

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। এ ভাঙনকে রাশিয়ার জন্য একটি ভূরাজনৈতিক বিপর্যয় বলে মনে করেন বর্তমান রুশ নেতৃত্ব। এ সময়ই ভেঙ্গে দেয়া হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক জোট ওয়ারশ, তারপর থেকে রাশিয়া দেখছে, সামরিক জোট ন্যাটো ধীরে ধীরে তাদের ঘিরে ফেলছে, যদিও ওয়ারশ ভেঙ্গে দেয়ার শর্তই ছিল যে ন্যাটো পূর্ব ইউরোপে হাত বাড়াবে না। তাই সংগত কারণেই রাশিয়া তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ১৯৯৯ সালে চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দেয়। ২০০৪ সালে যোগ দেয় বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া ও স্লোভাকিয়া। ২০০৯ সালে যোগ দেয় আলবেনিয়া।

জর্জিয়া, মলদোভা বা ইউক্রেনেরও ন্যাটোতে যোগ দেয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু রাশিয়ার কারণে এখন পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনি। তবে এই তিন দেশে রুশপন্থী বিদ্রোহী আছে। এই দেশগুলোর কোনোটি যদি ন্যাটোতে যোগ দেয়, তবে তা রাশিয়ার জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হবে।

ন্যাটো (পশ্চীমা আধিপত্যবাদী) র আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্দেশ্যেই রাশিয়া আক্রমণ চালায় ইউক্রেনে। যার দৃষ্টিগ্রাহ্য অর্থ ছিল ন্যাটো যেন রাশিয়ার নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে প্রবেশের সুযোগ না পায়।

পশ্চিমা কোনো দেশ এখন পর্যন্ত ইউক্রেনে সেনা পাঠাতে সম্মত হয়নি। কিন্তু অস্ত্র, গোলাবারুদসহ সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ২৭টি দেশ। মার্কিন গণমাধ্যম স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনে যেসব অস্ত্র পাঠানো হচ্ছে, তার মধ্যে যুদ্ধ বিমান, গোলাবারুদ, ট্যাংক ও বিমান বিধ্বংসী অস্ত্রের মতো প্রাণঘাতী অস্ত্র রয়েছে।

ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর রাশিয়াকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পশ্চীমা বিশ্ব কর্তৃক একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় বিশ্বের সব দেশকে ছাড়িয়ে গেছে রাশিয়া। রাশিয়ার বিরুদ্ধে হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর আগে দেশটির বিরুদ্ধে ২ হাজার ৭৫৪টি নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। এ নিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার সংখ্যা সাড়ে ৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
প্রেসিডেন্ট পুতিন, তার সন্তানেরা ও তার ঘনিষ্ঠদের পাশাপাশি রাশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংক–প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা সুইফট থেকে দেশটির কয়েকটি ব্যাংককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্রসহ ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের আকাশসীমায় রাশিয়ার উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে দনবাস অঞ্চলে নতুন করে শুরু করা অভিযানে প্রায় ২০ হাজার ভাড়াটে যোদ্ধা মোতায়েন করেছে ক্রেমলিন। সিরিয়া, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁদের সেখানে জড়ো করা হয়েছে। কোনো ধরনের ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও সাঁজোয়া যান ছাড়াই তাঁদের যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। ইউরোপীয় এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান এসব কথা জানিয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, পূর্ব ইউক্রেনে মোতায়েন করা ভাড়াটে যোদ্ধার সংখ্যা ১০ থেকে ২০ হাজার হতে পারে। তাঁদের মধ্যে কতজন সিরিয়া, লিবিয়া ও অন্যান্য দেশ থেকে এসেছেন, তা আলাদা করে বলা কঠিন। রাশিয়ার মার্সেনারি কোম্পানি ‘ওয়াগনার গ্রুপ’ তাদের নিয়োগ দিয়েছে। ইউক্রেনের সেনাদের প্রতিরোধের বিরুদ্ধে তাদের কাজে লাগানো হচ্ছে। তারা মূলত পদাতিক।

রাশিয়া চাইছে দ্রুত যেনতেন প্রকারে ইউক্রেনের উপর সামরিক বিজয়ের ঘোষণা দিতে। আসলেই কি সে ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে যাবে? সামরিক যুদ্ধের পেছনে যে মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক চিন্তা ভাবনা কাজ করছে, তার সমাধান কি এত সহজেই হয়ে যাবে?

প্রায় শতবর্ষ যাবৎ আন্তর্জাতিক রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলার একচেটিয়া রাজত্ব করছে। জ্বালানি তেলের লেনদেনে ডলার ব্যবহারের মাধ্যমে সেই একচেটিয়াত্ব সর্বোচ্চ উচ্চতায় ওঠে। বহুবছর যাবৎ ডলার আর নিশ্চয়তা সমার্থক হয়ে আছে। এসবই বিভিন্ন দেশকে ডলারে রিজার্ভ রাখতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ডলারের এই অর্থনৈতিক আভিজাত্যের রাজনৈতিক সুফল ভোগ করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির শাসকেরা বহুবার এ সুবিধাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে ভিন্নমতালম্বী রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে। এসব আক্রমণে বিভিন্ন সময় তারা সহযোগী করে নিয়েছিল ‘পাউন্ড’ ও ‘ইউরো’কে। কোন দেশের বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাইলে প্রথমেই তার অর্থ আটকে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশল।
রাজনৈতিক কারণে ডলারকে ক্রমাগত মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারে অনেক দেশ এখন ত্যক্তবিরক্ত। যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে আফগানিস্তান থেকে রাশিয়া পর্যন্ত সবার ডলার-রিজার্ভ ইচ্ছেমতো আটকে দিচ্ছে, তাতে মধ্যপন্থী দেশগুলোর ভেতরও ভয় ঢুকেছে। এ রকম ভীতিকে কাজে লাগিয়েই ডলার আধিপত্যের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়তে চায় রাশিয়া।

ইউক্রেনে হামলার পর রাশিয়ার প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার আটকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ছিল বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম রিজার্ভ। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনের যোগাযোগব্যবস্থা ‘সুইফট’ থেকে তাদের অনেক ব্যাংককে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। রাশিয়া এ মুহূর্তে ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক লেনদেনব্যবস্থা থেকে অনেকখানি বাইরে। এর আগে গত কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক এক বাণিজ্যযুদ্ধ চালিয়েছে। ‘যুক্তরাষ্ট্রের এ রকম অর্থনৈতিক মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে এখনই দাঁড়ানো দরকার রাশিয়া, চীনসহ অন্যদের’ এরকমটা মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পাল্টা হিসেবে রুশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের একটা বড় প্রকল্প হলো ইউরেশিয়া ইউনিয়ন। ইউরেশীয়া ও চীনকে কাছাকাছি এনে এই পণ্ডিত দল বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারবিরোধী নতুন মুক্তাঞ্চল গড়তে চায়। তাদের পরিকল্পনা হলো ডলার আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইউক্রেন যুদ্ধটা আরও বড় পরিসরে করা। তাঁরা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কমবে এবং তা কমানোর সুযোগ কাজে লাগানো উচিত। শুধুমাত্র রাশিয়া নয়, চীন-ভারতও নতুন সেই চিন্তায় শামিল হতে আগ্রহী।

ওয়াশিংটনের জন্য হতাশার একটা দিক হলো চীন ও রাশিয়া নিজেদের মাঝে সুইফটের বাইরে অর্থনৈতিক বার্তা আদান-প্রদান করতে থাকায় তাদের বাণিজ্য-তথ্যে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো নজরদারি করতে পারছে না। ডলার আধিপত্য না থাকার আরেক পরোক্ষ মানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্তৃত্বও কিছুটা খর্ব হওয়া। আইএমএফকে ব্যবহার করে দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে যেভাবে তার পছন্দের অর্থনৈতিক মডেল গ্রহণে বাধ্য করেছে, সেটা আগামী দিনে আর সহজে না–ও হতে পারে। যেসব দেশ রাশিয়া, চীন, ইরান বা ভেনিজুয়েলার সঙ্গে নিজ মুদ্রায় লেনদেন করতে চাইছে বা চাইবে, তারা নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক কূটনীতিক চাপের শিকার হবে এ সময়।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শুরু হওয়া নব পর্যায়ের এ টানাপোড়েন ইউক্রেন যুদ্ধকেও দীর্ঘায়িত করবে। এ যুদ্ধের ফলাফলে এখন আর কেবল ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব নয়—বৈশ্বিক পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, তারও নিষ্পত্তি নির্ভর করছে। অনেকে মনে করছেন, এ যুদ্ধের ফয়সালা হবে সমরবিদদের হাতে নয়, অর্থনীতিবিদদের দ্বারা।
ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী নব বিশ্ব ব্যবস্থায় আমাদের অবস্থান কি হবে সে চিন্তা ও পদক্ষেপ ও আমাদের সুচিন্তিত ভাবে নিতে হবে। সরকারের পররাষ্ট্র, অর্থ, পরিকল্পনা সবার সম্মিলিত চিন্তা ভাবনার মাধ্যমে আমাদের সর্বোচ্চ বেনিফিট আদায় করার পরিকল্পনা গ্রহন পূর্বক সেই অনুযায়ী এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের পররাষ্ট্র নীতির মূল কথা হচ্ছে, ‘ সবাই আমাদের বন্ধু, কেউ আমাদের শত্রু নয়’। ইনশাআল্লাহ আমাদের এই মূলনীতি কে সমুন্নত রেখেই আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে সচেষ্ট থাকবো বলে বিশ্বাসী।

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536