শিক্ষকের খোঁজে!

শিক্ষকের খোঁজে!

শিক্ষক আছেন শিক্ষক!
শহর-গ্রাম, প্রাথমিক- বিশ্ববিদ্যালয়, দুর্লভ হয়ে উঠেছেন প্রকৃত শিক্ষক। যদি ‘পদ’ বিবেচনায় বলি তবে সর্বত্র আছেন তাঁরা। পাঠ্যক্রম অনুসারে পাঠদান করে যাচ্ছেন শ্রেণিকক্ষে এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরে। এই পদধারী শিক্ষকদের আমাদের নিকট আর দশটা চাকরিজীবীর মতোই মনে হয়। শিক্ষক বলতে ছোটবেলা থেকে যাদের দেখেছি, তাঁদেরকে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়নি। দেখেই বুঝে নেওয়া যেত ‘তিনি’ শিক্ষক। শুধু বিদ্যায়তনে নয়, গ্রামে, মহল্লায় যিনি শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁকে আমরা চিনে নিতাম তাঁর নৈতিকতা, আচরণ, কথা বলার ভঙ্গী, চলাচলনে ঋজুতা, সর্বোপরি ব্যক্তিত্ব দিয়ে।

মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়ের “ঘটনাচক্রে শিক্ষক হবেন না” এই বক্তব্যের অনেকেই নেতিবাচক বাখ্যা করছেন। আমি এই বক্তব্যের সাথে সম্পূর্ণ একমত। দেখুন অনেক যোগ্যতা সম্পন্ন ব‍্যক্তিরা এখন শিক্ষকতা পেশায় এন টি আর সি এর মাধ্যমে আসছেন। যারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনার্স/মাস্টার্স বি এড , এম এড করেছেন। পরীক্ষা ফেস করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়েছেন। এন টি আর সি এর পূর্বে বিপরীত চিত্রও রয়েছে। কিছু সংখ্যক মানুষ ম‍্যানেজিং কমিটিকে হাত করে বা এলাকার বা রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে এসেছেন একথা অস্বীকার করা যায় কি? অনেক মেধাবী প্রার্থী চাকুরী বঞ্চিত হয়েছেন। এদের অনেকেই অনেক ভালো কিছু হবার যোগ‍্যতা রাখেন। রাষ্ট্র তাদের যোগ‍্য জায়গায় বসাতে পারেনি এটা রাষ্ট্রের ব‍্যর্থতা। কিন্তু একথাও সত্যি তারা অনেকেই কোনদিনই শিক্ষক হতে চাননি কিন্তু শিক্ষক হয়েছেন, ফলে এ পেশায় তাদের আন্তরিকতা, ভালোবাসার ঘাটতি রয়েছে। তাদের যোগ্য প্রাপ্য দেয়া হচ্ছে না বলে হতাশা রয়েছে। আবার অনেকেই শিক্ষাগত যোগ্যতা, আচরণ , বৈশিষ্ট্য শিক্ষক হবার যোগ্য নন এ কথাটিও সত্য। অনেক পুরুষ শিক্ষক এ পেশার পাশাপাশি অন‍্য ব‍্যবসা বানিজ্যের চিন্তা নিয়ে এসেছেন বা করছেন, অনেক মহিলা শিক্ষক এটিকে ঝামেলা বিহীন নিরাপদ চাকরি মনে করে এসেছেন যা এ পেশার উদ্দেশ্য কে ব‍্যাহত করে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জিম্মি না করে প্রাইভেট পড়ানো কে ভালো মনে করেন অনেকেই, কারন এতে শিক্ষক তার সংশ্লিষ্ট পেশায় নিয়োজিত থাকেন। সুতরাং প্রকৃত মেধাবীদের যথাযথ সম্মান, মর্যাদা ও সুযোগ সুবিধা দিয়ে এ পেশায় আসার সুযোগ করে দিতে হবে। সহকারী শিক্ষকদের মত সহ প্রধান, প্রধান শিক্ষক ও এন টি আর সি এর মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হবে। বদলি , এ সি আর , পদোন্নতি, শাস্তি সব কিছুই থাকতে হবে। আর সবশেষে ভালোবাসা ,আন্তরিকতা,আচরণ, অধ‍্যাবসায়ের মাধ‍্যমে তাদের সত‍্যিকারের শিক্ষক হয়ে উঠতে হবে। এ জাতির পরিবর্তন শুধু মাত্র শিক্ষকরাই করতে পারেন এ কথাটিও সকলকে উপলব্ধি করতে হবে।
“শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার,
দিল্লির পতি সে তো কোন ছার,
ভয় করি না’ক আমি ধারি না’ক ধার”।

শুধু শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করলেই হবে না বরং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে। মনে রাখতে হবে শিক্ষকতা চাকুরি নয় বরং পেশা যার মধ্যে আবেগ রয়েছে, রয়েছে ভালোবাসা, চাকুরি পেলেই শিক্ষক হওয়া যায় না, নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষক বানাতে হয়। যাদের মাধ্যমে আঁধার কেটে একদিন ভোরের আলো ফুটবেই।

আজকাল বিদ্যায়তনে গিয়েও চিনে নেওয়া মুশকিল যে, কে শিক্ষক। আমরা যাদের শিক্ষক বলে জেনে এসেছিলাম, তাদের বেশিরভাগই শিক্ষকতায় এসেছিলেন এই পেশাকে ভালোবেসে। তারা জানতেন এই পেশা সমাজের সর্বোচ্চ মর্যাদার দাবীদার। একই সঙ্গে তাদের ছিল নিজের জ্ঞানকে অন্যের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার স্পৃহা। সেই সময়ের শিক্ষকরা আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন না। বিশেষ করে স্কুলের শিক্ষকদের নিয়ে নাটক সিনেমায় হেঁয়ালি করেই বলা হতো ‘গরিব স্কুল মাস্টার’। যারা কোচিং, টিউশনিতে বাজিমাত করতে পারেননি, তারা এখনও গরিবের সীমারেখা অতিক্রম করতে পারেননি। আর্থিকভাবে যেমন দারিদ্রের সীমা ডিঙানো যায়নি, তেমনি আবার ধীরে ধীরে শিক্ষকরা সম্মানের জায়গাতে গরিবের সীমানায় ঢুকে পড়েছেন। সমাজের আর্থিক সচ্ছ্লতা যত বেড়েছে, শিক্ষকের সম্মান ও মর্যাদা কমেছে তারচেয়েও বেশি। এর একটি বড় কারণ, শিক্ষকদের একটি বড় অংশের চাকরি এখন কারখানার শ্রমিকের মতোই মালিকের ইচ্ছের ওপর নির্ভরশীল। শ্রমিক তুল্য পেশায় যোগ্য শিক্ষক দুর্লভ হবেন এটাই স্বাভাবিক।

শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘অন্য কোনও পেশায় কাজ জুটাতে না পেরে অনেকে শিক্ষকতায় এসেছেন।’ কথা সত্য। কিন্ডারগার্টেন, প্রাথমিক, উচ্চ মাধ্যমিক থেকে শুরু থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি একথা নিশ্চিন্তে বলা যেতে পারে।

বিসিএস শিক্ষার বেলাতেও একই কথা। সরকারি স্কুল-কলেজে পড়ার অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই আছে। স্কুলের বেলাতে দেখেছি স্কুলটি সরকারি হওয়ার আগে যারা শিক্ষক ছিলেন তাদের সঙ্গে বিসিএস বা সরকারি কোটায় চাকরি প্রাপ্তদের পার্থক্য। এদের শিক্ষক হওয়ার কোনও প্রস্তুতি ছিল না। শিক্ষক হবেন এমন স্বপ্নও ছিল না তাদের। অন্য আর দশটা চাকরি হিসেবে নিয়েছিল এই পেশাকে। তাই তাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি, মেধার দ্যুতি ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ‘শিক্ষক’ এর দূরত্ব অনেক। এখানে একথাও স্বীকার করে নিতে হয় সরকারি কোটা ছাড়া যাদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি, তাদেরও একটি অংশ নিরুপায় হয়ে এই পেশায় এসেছিলেন। প্রতিষ্ঠাতা, গভর্নিংবডির আত্মীয় পরিজনের কোটায় তারা চাকরি পান। অর্থাৎ জ্ঞানে ও মানসিকতায় তারাও শিক্ষক হবার জন্য তৈরি ছিলেন না। এখনও নেই। পেশাগত ও সাংগঠনিক কাজে বিদ্যায়তনে যেতে হয় নিয়মিত। বেসরকারি ও সরকারি দুই দিকেই দেখেছি বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক সংকট। এবং প্রত্যাশিত শিক্ষকের অনুপস্থিতি।
বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষকগণ যে পরিবেশ তৈরি করেছেন তাতে তাদের নিজেদের মর্যাদা নিজেরাই শূন্য করে ফেলেছেন। দেশ সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ভিসি ছিলেন যাকে অনেকে অনেক পদবীতে ভূষিত করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তিনি তার প্রায় দেড় যুগে (শাসনামলে) প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের দোরগোড়ায় নিয়ে দাড় করিয়েছিলেন।

বেসরকারি ও সরকারি দু জায়গাতেই প্রকৃত শিক্ষকদের স্বাগত জানানোর পরিবেশ নেই। গভর্নিংবডি, প্রতিষ্ঠাতারা শিক্ষকদের সঙ্গে ‘ভৃত্য’ তুল্য আচরণ করেন। তাদের খেয়ালে চাকরি হয়, তাদের খেয়ালে চাকরি যায়। আছে রাজনৈতিক প্রভাবও। রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শন না করলে চাকরি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। এমন বেশ কিছু বিদ্যায়তন দেখেছি যেখানে প্রধানশিক্ষক গভর্নিং বডির সদস্যের সন্তানের সামনে বসারও সাহস পান না।

সরকারি, বেসরকারি উভয়ক্ষেত্রেই দেখেছি সরকারি কর্মকর্তারা শিক্ষকদের সঙ্গে গ্রেড অনুসরণ করে ব্যবহার করেন। তাদের সঙ্গে শিক্ষক সুলভ আচরণ করেন না। আচরণ অধস্তনের মতো।

শিক্ষা দিবসে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকও সত্য ভাষণ দিয়েছেন-শিক্ষকরা রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের কথায় উঠ-বস করেন। নিয়োগ টেন্ডার সব কিছুতেই চলেন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে আঁতাত করে। ফলে শিক্ষক হিসেবে তাদের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হয় না। ‘শিক্ষক’-এর দেখা পেতে হলে আমাদের এজন্য বিনিয়োগ করতে হবে। শুরু করতে হবে প্রাথমিক থেকে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আর্থিক ও সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের রাজনৈতিক ও গর্ভনিং বডি’র প্রভাবমুক্ত করতে হবেই। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও শিক্ষকদের চাকরি নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। সম্মান ও আর্থিক সচ্ছ্লতা নিশ্চিত না করে আমরা এই পেশাকে জীবনের লক্ষ্য বা পথিকৃৎ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো না। এক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের চেয়ে সরকারের ইচ্ছে ও উদ্যোগ জরুরি।
শিক্ষক গনের অর্থনৈতিক, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে প্রথমে। এরপর তাদের নৈতিকতা সঠিক মাত্রায় ধরে রাখতে হবে, যাতে তারা তাদের হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। এক্ষেত্রে উদ্যোগ নিয়ে শুরু করতে হবে সরকারকেই।

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536