মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘে ভোট প্রদানে বিরত রইল বাংলাদেশ।

মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘে ভোট প্রদানে বিরত রইল বাংলাদেশ।

মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘে ভোট প্রদানে বিরত রইল বাংলাদেশ। ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরা।


মহসিন মুন্সী, ব্যুরো চীফ।

সামরিক অভ্যুত্থান পরবর্তী মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘে তোলা একটি প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিষয়টি ‘যথাযথভাবে না আসায়’ হতাশা প্রকাশ করে ভোটদানে বিরত থেকেছে বাংলাদেশ।

জাতিসংঘে ওই ভোটাভুটির পরদিন  এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করে একটি বিবৃতি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা শুক্রবার সাধারণ পরিষদে বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের মূল যে কারণ, তা স্বীকার করে না নিলে এবং তার সমাধানে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা না হলে মিয়ানমার বিষয়ে যে কোনো প্রস্তাব ‘অসম্পূর্ণ’ থেকে যাবে।

“২০১৭ সালে যে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানো হল, তারপরও সঙ্কটের মূল কারণগুলো স্বীকার করে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতায় মিয়ানমারে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে; এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, অন্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে।”  

বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও জরুরি মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ।

বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা আগে থেকেই বাংলাদেশের আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে ছিল। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের গ্রামে গ্রামে নতুন করে দমন অভিযান শুরু করলে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে।

এসময় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। তাদের কথায় উঠে আসে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও, পোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ, যাকে জাতিগত নির্মূল অভিযান বলেছে জাতিসংঘ।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও সেই প্রত্যাবাসন আজও শুরু হয়নি।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা সামরিক জান্তার নিন্দা জানিয়ে শুক্রবার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।সেখানে মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি অং সান সু চি সহ সকল রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটিতে ১১৯টি দেশ ওই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন দিয়েছে। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে কেবল বেলারুশ। আর ৩৬টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল, যাদের মধ্যে রাশিয়া ও চীন ও ছিল যাদেরকে মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওই দুটি দেশ মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি অস্ত্রও বিক্রি করে।

বাংলাদেশ কেন ভোটদানে বিরত থাকল, সেই ব্যাখ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গারা যাতে মিয়ানমারে নিজ বাসভূমে ফিরে যেতে পারে, সেজন্য কোনো সুপারিশ কিংবা পদক্ষেপের কথা ওই প্রস্তাবে রাখা হয়নি। এমনকি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই এবং মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন, সে বিষয়েও কিছু বলার বা জোর দেওয়ার কোনো চেষ্টা ওই প্রস্তাবে ছিল না। “সামগ্রিক বিবেচনায় রোহিঙ্গা সঙ্কটের যে মূল কারণ, তা স্বীকার করে নিতে আগ্রহের ঘাটতি ছিল ওই প্রস্তাবে।”

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হওয়া প্রস্তাব মানার কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। তবে পাস হওয়া প্রস্তাবে যে ভাষায় মিয়ানমারের জান্তার নিন্দা করা হয়েছে, তা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

যারা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে, তাদের মধ্যে জাতিসংঘে মিয়ানমারের দূত কাইউ মোয়ে তুন ও রয়েছেন। যিনি দেশটির ক্ষমতাচ্যুত বেসামরিক সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন। পদত্যাগ করতে জান্তা সরকারের নির্দেশও তিনি মানেননি। জাতিসংঘ এই প্রস্তাব পাস করতে এতো দীর্ঘ সময় নেয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন কাইউ মোয়ে তুন। পক্ষে ভোট দিলেও তার ভাষায় ওই প্রস্তাব ‘যথেষ্ট দুর্বল’।

নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, এই প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটিতে মিয়ানমারের প্রতিবেশী চীনের ভোটদানে বিরত থাকার বিষয়টিও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে, কেননা এর আগে নিরাপত্তা পরিষদে একই ধরনের প্রস্তাবের সরাসরি বিরোধিত করেছিল ভোটো ক্ষমতার অধিকারী এই দেশটি।

মিয়ানমারে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে চীনের। সাম্প্রতিক সময়ে চীন সরকারের বিভিন্ন আচরণে এমন ধারণা হওয়াই স্বাভাবিক যে জান্তা সরকারকে বৈধতা দিতে তাদের ‘আপত্তি নেই’।

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে যা যা ঘটেছে, সেসব বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ এ পর্যন্ত নিরপাত্তা পরিষদ নিতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে কূটনীতিবিদ ও অধিকারকর্মীদের মধ্যে হতাশা রয়েছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা শুক্রবার সাধারণ পরিষদের বলেন, “মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান এবং বাস্তচ্যুত অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ওপর সামরিক অভ্যুত্থানের যে প্রভাব, সে বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বক্তব্য আসায় আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। “ফলে আজ যখন সাধারণ পরিষদ এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে প্রস্তাব তুলতে গিয়ে সেই অবস্থান থেকে সরে গেল, বিষয়টি আমাদের হতাশ করেছে। সাধারণ পরিষদের এই ভূমিকা ভুল সংকেতই দেবে।” 

তবে এই কূটনীতিবিদ রোহিঙ্গাদের যথাযথ প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা চলমান রেখে সাফল্য অর্জনে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী দাবি করেছিল, রোহিঙ্গারা বৌদ্ধ সংখ্যাগুরু মিয়ানমারে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু ‘নিজেদের ঘরই আগুনে পুড়িয়ে দেয়নি’ বরং সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার ‘গল্পও বানিয়েছিল’। নিজের দেশের সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে সেনাবাহিনী গণহত্যায় নেমেছে- এই সত্য মেনে নেওয়াও মিয়ানমারের সংখ্যাগুরু জোতিগোষ্ঠীর অনেকের জন্য বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।

“গত ৭০ বছরে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী গুলো যে অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছে তার সঙ্গে আপনি যদি এখনকার পরিস্থিতির তুলনা করেন, তাতে বলা যায় বামার জাতিগোষ্ঠী সে ধরনের কোনো কষ্টই সহ্য করেনি।” সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করার পর মিয়ানমার এখন ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। “এই সব হত্যা, সহিংসতার মধ্যে, সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার এই পরিবর্তিত চেহারাকে স্বীকৃতি এবং উৎসাহ দিতে হবে। একটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কার্যক্রম গড়ে উঠছে, যা পুরনো বিভেদ ও সংস্কার গুলোকে ঝেড়ে ফেলছে এবং এমন একটি ভবিষ্যৎ মিয়ানমারের আশা দেখাচ্ছে, যা এর বৈচিত্র্যকে শান্তির সঙ্গে আলিঙ্গন করবে।”

এপ্রিলের শুরুতে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে অবস্থান জানাতে ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ নামে একটি ছায়া সরকার গঠন করা হয়। এতে প্রথমবার প্রকাশ্যে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে অনুমোদন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় একটি সংবিধান প্রণীত হলে ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সংখ্যাগুরু বামারদের শ্রেষ্ঠত্বের কবল থেকে মুক্তি পাবে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী গুলো। নবগঠিত এই ছায়া সরকারের মন্ত্রিসভায়ও বেশি সংখ্যক সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্যকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তাদের সংখ্যা অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির আগের সরকারের মন্ত্রিসভার চেয়ে বেশি।

কারেন জাতিগোষ্ঠীর একটি সশস্ত্র দল ‘কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন’ দলের মুখপাত্র পাদোহ স মান মান বলেন, “আমরা এখন বামার জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তাতমাদোর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে পারলে জয় আমাদের হবেই।” 

বিশ্লেষন বলছে বর্তমান পরিস্থিতিতে মায়ানমারের সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। এখন দেখার বিষয় ঐক্যপ্রক্রিয়া কতটুকু সফলতা অর্জন করতে পারে, নাকি পূর্বের ন্যয় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536