আমদানি করা হয় এ্যামবুলেন্স, বাজারে বিক্রি হয় মাইক্রো বাস

আমদানি করা হয় এ্যামবুলেন্স, বাজারে বিক্রি হয় মাইক্রো বাস

মহসিন মুন্সী, ব্যুরো চীফ।

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বিপর্যস্ত সারা বিশ্ব। অন্যান্যদের মতোই মহামারি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে টিকা দান সহ চিকিৎসা সেবায় নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। যার কারণে দেশে স্বাস্থ্য সেবা সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানিও বেড়েছে। মহামারির মধ্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের পাশাপাশি এ্যাম্বুলেন্সের আমদানি বেড়েছে দেশের কাস্টম হাউসগুলোতে। করোনাকালীন রোগীদের তাৎক্ষনিক পরিবহন সেবা দিতেই আসছে এই এ্যাম্বুলেন্সগুলো। এটি সু-সংবাদ মনে হলেও এর আড়ালে রয়েছে এক শুভঙ্করের শুল্ক ফাঁকির গল্প।
বিদেশ থেকে আমদানি করা এ্যাম্বুলেন্স গুলো সীমান্ত পেরিয়েই হয়ে যাচ্ছে দামি মাইক্রোবাস। আর শুল্ক-কর সুবিধার কারণে গাড়ি প্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা যাচ্ছে একটি অসাধু সিন্ডিকেটের পকেটে। এতে করে একদিকে সরকার যেমন বড় অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত গাড়ি আমদানিকারকরা মাইক্রোবাস বিক্রির বাজার হারাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান বলছে বিগত পাঁচ বছরে দেশে এ্যাম্বুলেন্স আমদানি ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েছে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর ও শুল্ক ষ্টেশন চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্স এসেছে ২ হাজার ১৭০টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে। ওই বছরে মোট ৭৬৩টি এ্যাম্বুলেন্স আসে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে। তথ্যানুসারে, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ৩০৪টি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭৬৩টি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩০টি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৫২টি এবং ২০২০-২১ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসেছে ২১৭টি এ্যাম্বুলেন্স। মূলত রেয়াতি সুবিধার শুল্কের টাকা পকেটে নিতে অ্যাম্বুলেন্স আমদানির কদর বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশংকা।

এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান অভিযোগ করে বলেন, দেশে এখন মাইক্রোবাস আমদানি হচ্ছে না বা কমে গেছে। সব নাকি এ্যাম্বুলেন্স আসছে। পরে এগুলো দেশে এসে মাইক্রোবাসে কনভার্ট হয়। কারা এই সুবিধার অপব্যবহার করছে এটা আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার।
আবার মাইক্রোবাসকে এ্যাম্বুলেন্স ঘোষণা দিয়েও খালাস করার নজির রয়েছে। করোনা মহামারির প্রথম দিকে ২০২০ সালের জুলাই মাসে এমন একটি ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে এক হাজার ৩০০টি নোয়া ও হাইএইস মডেলের মাইক্রোবাসকে এ্যাম্বুলেন্স ঘোষণায় বের করে নেওয়ার প্রচেষ্টা হয়েছিল। এমনকি এগুলোর মধ্যে অর্ধেকে খালাসও হয়েছিল। সে ঘটনা আর চাপা থাকেনি। অভিযোগ ছিল, গাড়ি ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ দুই নেতা ও কাস্টম হাউজের দুই ডেপুটি কমিশনারের যোগসাজশে ওই চালানগুলো বের করা হয়েছিল। এর পরপরই এনবিআর এ বিষয়ের নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এর আগের বছর (২০১৯ সালে) গাজীপুরে এ্যাম্বুলেন্স ঘোষণায় আমদানি করা পাঁচটি মাইক্রোবাসের রেজিস্ট্রেশনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম ৫৫টি অ্যাম্বুলেন্সের চেসিস নম্বর উল্লেখ করে এ বিষয়ে রেজিস্ট্রেশন না দিতে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি দেন। যদিও বিআরটিএ কি ব্যবস্থা নিয়েছিল, সে বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত কোনো জবাব পাননি বলে কাস্টম কমিশনার দাবি করেন।
এর কিছুদিন পর কমিশনার ফখরুল ইসলাম এনবিআর চেয়ারম্যান কে সার্বিক বিষয়ে অবগত করে চিঠি দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, পাঁচটি এ্যাম্বুলেন্স মাইক্রোবাস হিসেবে রেজিস্ট্রেশন নেওয়া হয়েছে, তা সঠিক কি না জানাতে বিআরটিএ চেয়ারম্যানকে কয়েকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো ধরনের জবাব দেয়নি কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে এ্যাম্বুলেন্স আমদানিকারক দের বিবরণে বলেন- এসআই অটোমোবাইলস, টারবো অটো, এফবিটি অটোমোবাইলস, জেআর অটোমোবাইলস ও লামিয়া এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এসব মাইক্রোবাসকে এ্যাম্বুলেন্স দেখিয়ে আমদানি করেছিল। পাঁচটি ছাড়াও অন্য মোটরযানের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাই সুযোগের অপব্যবহার রোধে তিনি এনবিআর চেয়ারম্যানকে দেওয়া চিঠিতে কয়েকটি সুপারিশ যোগ করেন।
সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে, এ্যাম্বুলেন্স হিসেবে শুল্ককর নগদে আদায় করা, মাইক্রোবাস ও এ্যাম্বুলেন্সের পার্থক্যজনিত শুল্ককর ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে রেখে মোটরযান খালাস করা, ছয় মাসের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে রেজিস্ট্রেশনের দলিল দিলে ব্যাংক গ্যারান্টি ফেরত দেওয়া, এরই মধ্যে যেসব কর্মকর্তা এ্যাম্বুলেন্সকে মাইক্রোবাস হিসেবে রেজিস্ট্রেশন দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করতে বিআরটিএ চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করা ইত্যাদি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার ফখরুল আলমসূত্রে জানা যায় , এ্যাম্বুলেন্স ঘোষণায় মাইক্রোবাস রেজিস্ট্রেশন হওয়াটা এক ধরনের অপরাধ ও দেশের ক্ষতি। আমরা ইতিমধ্যে কয়েকটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি। এছাড়া বিআরটিএকে বিষয়টি অবগত করে রেজিস্ট্রেশন করার আগে সংশ্লিষ্ট কাস্টম হাউসের মাধ্যমে কাগজপত্র যাচাই করার অনুরোধ করেছি। এনবিআরকে বিষয়টি অবগত করে বেশকিছু সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি যাতে এ্যাম্বুলেন্স আমদানির বিপরীতে শুল্ক সুবিধার অপব্যবহার না হয়।
এনবিআর সূত্র বলছে, নাভানা ট্রেডিং, আকিজ মোটরস, মিরাজ কারস, গ্রীনল্যান্ড অটো, এলএনবি অটোমোবাইলস, হাবিব অ্যান্ড ব্রাদার, হাতিম করপোরেশন, এফবিটি অটোমোবাইলস, কেআরএস করপোরেশন, জারা ইন্টারন্যাশনাল, আরকে ইন্টারন্যাশনাল, আনোয়ার ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এমএন অটোমোবাইলস, আবিদ অটোমোবাইলস, ম্যাক্স পাওয়ার বাংলাদেশ, ডায়নামিক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এইচএ ট্রেডিং, এসএম অটোমোবাইলস, এনএফ এন্টারপ্রাইজ সহ আরো বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এ্যাম্বুলেন্স আমদানি ও বিক্রয় করে থাকে।

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536