মুক্তিযুদ্ধে শাহাদৎ বরণের ইতিহাস DARPON TV

মুক্তিযুদ্ধে শাহাদৎ বরণের ইতিহাস DARPON TV

মহসিন মুন্সী, বিশেষ প্রতিনিধি, ফরিদপুর। ৯ ডিসেম্বর ২০২০।

আজ ৯ ডিসেম্বর। ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়। আজকের এই দিন ফরিদপুরের অসম সাহসী তরুণ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শাহাদৎ বার্ষিকী।
জাতীয় বীর , আমাদের গৌরব কাজী সালাহ উদ্দিন নাসিম এবং মেজবাহ উদ্দিন নৌফেল সহ মোট ছয় জন বাংলা মায়ের দামাল সন্তান ১৯৭১ সালের এই দিন কানাইপুরের নিকটে করিমপুরে হানাদার পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। শহীদদের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই ।
মেজবাহ উদ্দিন নৌফেল ছিলেন ফরিদপুর শহরের হাবেলী গোপালপুরের জনাব মো: আব্দুল বারী ও বেগম ফাতেমা বারীর ৫ম সন্তান ।
তিনি সরকারী রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্র ছিলেন ।
সালাহ উদ্দিন নাসিম ছিলেন ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলির জনাব কাজী জালাল উদ্দিন ও বেগম আমেনা জালালের ২য় সন্তান। তিনি সরকারী ইয়াছিন কলেজের ছাত্র ছিলেন ।
ফরিদপুরের রাস্তা -ঘাটে, মাঠে-ময়দানে, ভবনে-তোরণে , সেতুতে-স্থাপনাতে এদের নাম খোদাই করা না থাকলেও ফরিদপুরের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের হৃদয়ে ও মস্তিষ্কে এদের নাম চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে ।আজ ৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের এই দিন ফরিদপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন কাজী সালাউদ্দিন ও তার বাহিনীর ৬ যোদ্ধা পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন।
সালাউদ্দিন ছাড়াও সেদিন শহীদ হন নৌফেল, ওহাব, মুজিবর, দেলোয়ার, আদেল ও সোহরাব।
বিজয়ের ৪৯ তম বর্ষপূর্তিতে দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে সেই যুদ্ধের ঘটনা তুলে ধরা হল।

১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর দুপর ১২টার দিকে যশোর-ফরিদপুর সড়কের করিমপুর এলাকায় এক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন সেনাবাহিনীর জিপ নিয়ে ঢুকে পড়েন। কমান্ডার সালাউদ্দিন ওই পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। গর্জে ওঠে তার হাতের এলএমজি। রক্তে ভেসে যায় পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের জিপ। এর আধা ঘণ্টা পর যশোর থেকে আসা সেনা সাঁজোয়া বহর তিনদিক থেকে সালাউদ্দিন বাহিনীর ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ঘিরে ফেলে।
শুরু হয় তুমুল সম্মুখযুদ্ধ। বাকি সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সাহসী সালাউদ্দিন এলএমজি হাতে পাকিস্তানি সেনাবহরের সামনে দাঁড়িয়ে ব্রাশ ফায়ার করতে থাকেন। তার ব্রাশ ফায়ারে অসংখ্য পাকিস্তানি সেনা রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে।
সালাউদ্দিনের এ অসীম সাহসিকতায় পাকিস্তানি সেনারা দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। একটু পরেই সংগঠিত হয়ে ফের হামল‍া চালায় সালাউদ্দিন বাহিনীর ওপরে।
ততোক্ষণে সালাউদ্দিনের গুলির মজুদ প্রায় শেষ। পরিস্থিতি বুঝে কৌশল পাল্টালেন তিনি। তার নির্দেশে জীবন বাঁচিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলেন সহযোদ্ধারা। জীবন বাজি রেখে বুক চিতিয়ে এলএমজি’র ট্রিগার চাপতে থাকেন সালাউদ্দিন।
পাকিস্তানি হানাদারদের বহরে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে সংখ্যায় বেশি হওয়ায় এক পর্যায়ে সালাউদ্দিনকে ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি সেনারা। ছুটে আসতে থাকে অসংখ্য গুলি। হঠাৎ পাকিস্তানি সেনাদের একটি বুলেট এসে উড়িয়ে নিয়ে যায় সালাউদ্দিনের এলএমজি’র ম্যাগজিন। আর একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় পিঠে। রক্তাক্ত সালাউদ্দিন কিছুটা দূরে একটি বাড়ির ঘরের পাটাতনে আশ্রয় নেন।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেই বাড়িতে ঢুকে বাড়ির সবাইকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর গুলিবিদ্ধ সালাউদ্দিনকে ঘরের ভেতর রেখে বাড়ি শুদ্ধ আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। জীবন্ত দগ্ধ হয়ে শহীদ হন ২২ বছর বয়সী তরুণ যোদ্ধা কাজী সালাউদ্দিন।

১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর ১৭ ডিসেম্বর ফরিদপুর পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হলে সেই বাড়িতে শহীদ সালাউদ্দিনের কঙ্কাল শনাক্ত করা হয়। সেদিনই তাকে ফরিদপুর শহরের আলিপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

বিজয়ের ৭ দিন আগে ৯ ডিসেম্বর ফরিদপুরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য করিমপুরের এ সম্মুখযুদ্ধে সালাউদ্দিন বাহিনীর এ মহান আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গর্বের ইতিহাস। আমাদের শীর উচু করে, মেরুদণ্ড সোজা করে দাড়ানোর উপাত্ত।

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536