ভাস্কর্য গড়ব না ভাঙব! DARPON TV

ভাস্কর্য গড়ব না ভাঙব! DARPON TV

মহসিন মুন্সী, বিশেষ প্রতিনিধি।
৯ ডিসেম্বর ২০২০।

দেশে সম্প্রতি উদ্ভুত বিরূপ পরিস্থিতির বিষয়ে আমাদের আরো স্বচ্ছ ধারণা হওয়া উচিত, শুধু শুধু ইমোশন দিয়ে কোন কিছুর পক্ষে বা বিপক্ষে যাওয়া উচিত নয়। যেহেতু রাষ্ট্র ও জাতীয় নেতার মত সেনসিটিভ বিষয় জড়িত, সেহেতু এসব বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে আমাদের অনেক বেশি জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
বুঝে শুনে মন্তব্য করতে হবে, তাতে অন্তত নিজেদের মধ্যে বিভেদ কমবে বলে আশাবাদী।

রাষ্ট্রীয় স্বার্থে, এবং ধর্মীয় স্বার্থে আমরা অারো বেশি সহনশীল হতে চেষ্টা করলেই ভাল হয়।
না জানলে জানার চেষ্টা করব, না বুঝলে চুপ থাকবো।
শুধু শুধু নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে লিপ্ত হব না।
এ দেশটা আমাদের। অনেক চেষ্টা চালাবে আমাদের মধ‍্যে বিভেদ তৈরির। যে যত ভাগে বিভক্ত করুক না কেন, সার্বভৌম স্বার্থে, জাতীয়তা বোধের স্বার্থে আমরা সবাই এক এবং অভিন্ন।
মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যকার প্রার্থক্য বুঝার চেয়ে মূর্তি ও ভাবমূর্তির মধ্যকার প্রার্থক্য বুঝা বেশি জরুরি। বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি জলাঞ্জলি দিয়ে যারা এই দুর্যোগকালীন সময়ে তাঁর ভাস্কর্য বানানোকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন তারা যদি বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তির প্রতি একটু শ্রদ্ধাশীল হতে পারতেন তবে তা দেশ ও মানুষের জন্য আরো বেশি কল্যাণকর হত। আর যারা ইসলামের নামে মূর্তি ভাঙার আন্দোলন শুরু করেছেন তারাও যদি ইসলাম ধর্মের সত্যিকারের ভাবমূর্তির প্রতি একটু শ্রদ্ধাশীল হতে পারতেন তবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আরো বেশি উপকৃত হতেন।

সমাজ, রাষ্ট্র বা বিশ্বে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হলে সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিতে হবে। ক্ষনিকের বাহবা পাওয়ার জন্য, সম্ভাব্যতা যাচাই না করে, যে সব আন্দোলন আমরা ইসলামের নামে করছি তা দুইদিন পরেই মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ‍্য। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে এসব বিশেষ কোন অর্থ বহন করে কি?

এসব অর্থহীন দাবি বা আন্দোলনের কারণেই ইসলাম ধর্মের ভ্যালু প্রপোজিশন বা পজিশনিং নির্ণয় এবং নির্ধারণ করা খুব কঠিন| ম্যাকডোনাল্ড বললে আমরা সাশ্রয়ী ফাস্টফুড বুঝি, টয়োটা মানে রিলায়েবল গাড়ি, কোকাকোলা মানে সফট ড্রিংকস| কিন্তু ইসলাম ধর্মের ভ্যালু প্রপোজিশন কি ? ইসলাম ধর্ম বলতে আসলে কি বুঝায় ? একজন মানুষ, একটা সমাজ, রাষ্ট্র বা পৃথিবী ইসলাম থেকে কিভাবে লাভবান হবে ? ইসলাম প্রতিষ্ঠা মানে পৃথিবীতে কি পরিবর্তন আনা ?

মূর্তি/ ভাস্কর্য গুড়িয়ে দেয়ায় সমাজের মানুষের কি কল্যাণ আছে ? এই মহাদুর্যোগে,এই মানবিক বিপর্যয়ে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি কি আর নাই ? ভাস্কর্যকে মূর্তি বা প্রতিমা ধরে নিয়েই বলছি, মানুষ মূর্তির পূজা করে তাই মূর্তি ভেঙে ফেলতে হবে ? মানুষ গাছেরও পূজা করে, তো সব গাছ কেটে ফেলতে হবে ? বিভিন্ন জীব-জন্তুরও পূজা করে, পাহাড় বা পাথরের পূজাও করে, তাহলে ?
নবীজি (সঃ) কাবার মূর্তি ভেঙ্গেছেন মক্কা বিজয়ের পর| কাবা তখন থেকে ইসলামের অবিসংবাদিত তীর্থ। সেখানে তো কোন অমুসলিম নাই। মূর্তি, ভাস্কর্য, ছবি সরিয়ে রাখার বিপক্ষে কারো অভিমত নাই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রেডিও পাকিস্তানের নাম রেডিও বাংলাদেশ হবে এটাই তো স্বাভাবিক।
কিন্তু বাংলাদেশে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা আছে যারা মূর্তির পূজা করে, ভাস্কর্যকে ভক্তি করে। আমাদের দৃষ্টিতে তা শিরিক হলেও তার দৃষ্টিতে তো ইবাদত। মূর্তি আর ভাস্কর্যের মধ্যে কোন প্রার্থক্য নাই বলেই তো সে মূর্তি বা ভাস্কর্য ভাঙ্গার দাবি তোলা যাবে না। আমরা সে মূর্তি ভাঙ্গা তো দূরের কথা তাকে অশ্রদ্ধাও করতে পারি না। সে মূর্তি আরেকজনের দেবতা। আমাদের নবীর কার্টুন আঁকা যাবে না কিন্তু আরেকজনের দেবতা বা শ্রদ্ধার প্রতীককে গুড়িয়ে দেয়া যাবে, এই শিক্ষা ইসলাম দেয় কি? সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু বা খ্রিষ্টান দেশে মসজিদ থাকতে পারবে কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে মূর্তি থাকতে পারবে না ?
মূর্তি, ভাস্কর্য, প্রতিমা, বা কোন প্রাণীর প্রতিকৃতি যে সারা দেশ বা দুনিয়া থেকে সরানো সম্ভব নয় তা আমরা সবাই বুঝি। তবুও সারা দেশ থেকে শিরক উচ্ছেদের যে অভিযান আমরা শুরু করেছি তা যে “জুতা-আবিষ্কার” কবিতার চামড়া দিয়ে সারা পৃথিবী মুড়ে দেয়ার মত প্রকল্প তা কি আমরা বুঝতে পারছি ? সারা দুনিয়া চামড়ায় মুড়ে দেয়া সম্ভব নয়, তার চেয়ে নিজের পায়ে জুতা পরাই সহজ সমাধান।
মূর্তি আর ছবির মধ্যে প্রার্থক্য কি ? শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন প্রার্থক্য নাই।
মূর্তি পূজা কেন শিরক ?
একটা প্রাণহীন পাথরের মূর্তি কেন সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতিপক্ষ ? কারণ কারো মূর্তির পূজা মানে তার ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পন করা। আমরা একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করি মানে একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পন করি|

কিন্তু বাস্তবে আমরা কি আল্লাহর হুকুম মানি?
আল্লাহর নির্দেশের বিপরীতে পীর, শায়খদের নিঃশর্ত অনুসরণ, অন্ধ অর্চনাও মূর্তি পূজার মতোই শিরক। বিশেষ করে যারা কোরআন হাদিস ও বাস্তবতা বিবর্জিত হয়ে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে রাখে। ইসলাম ধর্মের মূলনীতি এতই অবিসংবাদিত যে তা সবাই সানন্দে, স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই গ্রহণ করবে কিন্তু আমরা সেসব মূলনীতি নিয়ে কথা বলি না।
যারা ভাস্কর্য তৈরির জন‍্য বদ্ধপরিকর তাদের ও উচিৎ এদেশের বাস্তবতা অনুধাবন করে সিদ্ধান্ত নেয়া। মুষ্টিমেয় কিছু লোকের পরামর্শে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা না করা।

সর্বোপরি দেশটা আমাদের, কোন সমস্যায় পড়লে আমাদেরকেই মোকাবেলা করতে হবে। তাই যদি আমরা সত‍্যিই দেশপ্রেমিক হই, দেশকে নিয়ে ভাবি, তবে আমাদেরকে ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নিতে হবে। যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদেরকে ধিক্কার না দিতে পারে।

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536