ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম এর”অপেক্ষার কী শেষ নেই ?”

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম এর”অপেক্ষার কী শেষ নেই ?”

প্রতিদিনের মতো বৃদ্ধাশ্রমের গেটে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন শফিক মিয়া। বৃদ্ধাশ্রমে আসার পর থেকে তিনি এমনটি করে আসছেন। একমাত্র ছেলের অপেক্ষায় তার যেন প্রহর কাটতেই চায়না। কিন্তু ছেলে গত চার বছরে একবারও তাকে দেখতে আসেনি। অবশেষে হৃদয়ে বেদনা জাগিয়ে একরাশ হতাশা নিয়ে ক্লান্ত পথিকের মতো বিফল মনোরথে তার নির্দিষ্ট ঘরে ফিরে যান।

শফিক মিয়া। বয়স ষাটোর্ধ। মাথার চুল, চোখের ভ্রু এবং দাঁড়ি পেকে ধবধবে সাদা। বয়সের ভারে ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। ইদানীং চোখেও কম দেখেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার এক বছরের মধ্যেই বৌমার প্ররোচনায় ছেলে তাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যায়। আর দেখা করতে আসেনি। ছেলের কাছে অনেক চিঠি লিখেও কোনো উত্তর পাননি। ছেলের কথা চিন্তা করে চোখে পানি এলেও তিনি মুছে ফেলেন। কারন চোখের পানিতে ছেলের অমঙ্গল হতে পারে।

অবসরের কিছুদিন আগে শফিক মিয়ার অজান্তে হঠাৎ ছেলে তার এক সহপাঠীকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে আসে। প্রথমে মন খারাপ হলেও বৌমার ব্যাবহারে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে মেয়ের মতো দেখতে থাকেন। বৌমাও তাকে পিতার মতো যত্নআত্তি করে। সবসময় অতি উৎসাহী হয়ে তার খাওয়াদাওয়া এবং সেবাযত্নে যেন কোনো প্রকার অবহেলা বা ত্রুটি না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখে। বৌমার ভদ্রোচিত আচরণ এবং মার্জিত ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে শফিক মিয়া মনে মনে গর্ব অনুভব করে ভাবেন, নিজের মেয়ে থাকলে হয়তোবা এতো কিছু করতো না। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন ছেলের সংসারে বাকি জীবনটা তিনি আরাম-আয়েশ কাটিয়ে দেবেন। এসময়ে তার হৃদয়ে বয়ে যায় অনেক আনন্দের সুবাতাস।

অবসরে যাওয়ার পর শফিক মিয়া বৌমা এবং ছেলের আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের একান্ত ইচ্ছায় বাড়িঘর এবং সম্পত্তি ছেলের নামে লিখে পেনশনের সমস্ত টাকা ছেলের একাউন্টে জমা করেন। এতে খুশি হয়ে, ছেলে এবং বৌমা তার সেবাযত্ন বাড়িয়ে জানায়, এখন থেকে তিনি বসে বসে খাবেন। সংসারের কোনো ঝামেলা তাকে পোহাতে হবেনা। তাদের কথা শুনে শফিক মিয়া তৃপ্ত হয়ে নিজেকে খুবই সুখী ভাবেন। বাইরে বেড়াতে গেলে বন্ধুবান্ধবদের কাছে খুব গর্ব এবং প্রশংসা করে বলেন, এযুগে তার ছেলে ও বৌমার মতো সন্তান পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু সহজসরল শফিক মিয়া বুঝতে পারেন না যে, ধুরন্ধর ও চতুর বৌমা ছলচাতুরী করে সবকিছু নিয়ে তাকে নিঃস্ব করেছে। উপরে ভালো মানুষী দেখিয়ে তলেতলে ভুল বুঝিয়ে বাবার বিরুদ্ধে ছেলেকে বিষিয়ে তুলছে।

তাইতো একদিন সকালে হাঁটার পর শফিক মিয়া বাড়িতে ফিরে দেখেন যে, তার বিছানাপত্র এবং কাপড়চোপড় বাহিরের ঘরে রাখা হয়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বৌমা এসে অত্যন্ত কর্কশ স্বরে জানায়, এখন থেকে আপনার জায়গা ওই ঘরে। হঠাৎ বৌমার এধরনের রুঢ় আচরণে শফিক মিয়া বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এসময়ে বৌমা তার হাতে বাজারের ব্যাগ ও টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, দাঁড়িয়ে না থেকে তাড়াতাড়ি বাজারে যান। ক্ষুধার্ত শফিক মিয়া মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বাজারের পথে বা বাড়ান। এসময় ছেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখলেও কোনো কথা বলেনা। যেতে যেতে শফিক মিয়া বৌমার এধরণের আচরনে বিস্মিত হয়ে ভাবেন, তাহলে বাড়িঘর, জমিজমা এবং পেনশনের টাকা নেওয়ার জন্য এতদিন কী ভালমানুষের অভিনয় না করেছে ? উদ্দেশ্য সফল হওয়ার পর আসল চেহারায় ফিরেছে। তিনি বুঝতে পারেন, এব্যাপারে ছেলের মৌনসম্মতি রয়েছে। তা নাহলে সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবকিছু শোনার পরও বৌমাকে কিছু বললো না কেন? এসময় শফিক মিয়ার দু’চোখ পানিতে ঝাপসা হয়ে আসে।

বাজার থেকে ফিরে শফিক মিয়া দেখেন তার ঘরে টিনের একটি রং চটা পুরনো থালায় বাসিভাত আর একটু ভাজি। তিনি না খেয়ে সরিয়ে রাখেন। কিছুক্ষন পর বৌমা এসে ১০০ টাকা হাতে গুজে দিয়ে নাতি সৌরভের মাসিক টিউশন ফি স্কুলে জমা দিয়ে আসার জন্য বলে। যাতায়াতের জন্য কোনো টাকা না দেওয়ায় শফিক মিয়া হেঁটেই রওয়ানা হন। দুপুরে ফিরে দেখেন যে, তার খাবার রুমে পাঠিয়ে ছেলে বৌমা ও সন্তানকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে খাচ্ছে। খাবার নিয়ে টেবিলে যেতে চাইলে বৌমা চরম অসন্তুষ্ট হয়ে বলে, এখন থেকে আপনি আপনার ঘরে বসে খাবেন। ছেলেও বৌমার কথায় মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। এসময় নাতি সৌরভ দাদুকে টেবিলে যেতে বললে বৌমা ও ছেলে তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়। এসব দেখে শফিক মিয়া খুবই কষ্ট পেয়ে ভাবেন, বৌমার কথায় ছেলে তাকে এভাবে অসন্মান করতে পারলো ?

শফিক মিয়া একজন কাজের লোক ছাড়া আর কিছুই নয়। বাজার করা, লন্ড্রীতে কাপড় নেওয়া, ব্যাংকে বিল জমা দেওয়া , নাতিকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া এবং স্কুল শেযে ফেরত আনা ইত্যাদি সবকিছুই করতে হয়। কখনও কখনও তাকে কাপড় ধোয়া এবং ঘরও ঝাড় দিতে হয়। ছেলে দেখেও না দেখার ভান করে। এতেও শফিক মিয়ার দুঃখ নেই। দুঃখ আর আপত্তি শুধু বৌমার খারাপ ব্যবহার, অশালীন কথাবার্তা এবং অভদ্রভাবে বকাঝকা নিয়ে। এব্যাপারে ছেলেকে জানিয়েও লাভ হয়নি। বরং নির্যাতনের মাত্রা আরও কয়েকগুন বেড়েছে। বাধ্য হয়ে তিনি সবকিছু সহ্য করে

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536