ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম এর”ভোদনের চালাকি”DARPON TV

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম এর”ভোদনের চালাকি”DARPON TV

আমাদের পাড়ার ভোদনকে ছোট-বড় সবাই এক নামে চেনেন। বয়স চল্লিশোর্ধ্ব। শরীর মোটাতাজা, মেজাজে রাশভারি। চালচলনে খুবই স্মার্ট। ভাবসাব দেখলে মনে হবে তিনি যেন কোনো নবাবের বংশধর। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করলেও কথাবলার সময় নিজের ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে ভুল হোক আর শুদ্ধ হোক ইংরেজিতে দু চারটি শব্দ প্রয়োগ করবেনই। এটা তার একটা স্টাইল।

ভোদন এখন পর্যন্ত বিয়ে করেনি। বিয়ের কথা উঠলেই বলে, আরে বিয়ের বয়স তো আর ফুরিয়ে যাচ্ছে না। সময় হোক ঠিকই একটা লাল টুকটুকে মেয়েকে বউ করে আনবো। ভোদনের কথা শুনে অনেকেই পেছন থেকে মুখটিপে হাসে বলে, লোকটার ভীমরতি ধরেছে। বয়স চল্লিশ পেরিয়ে পঞ্চাশের দিকে ধাবমান। অথচ বলে কী? তার নাকি বিয়ের বয়স এখনও হয়নি। ভোদন যদি কোনো বুড়িকে বিয়ে করে তবে তার বয়স ঠিকই আছে। এবয়সে লালটুকটুকে নয় একজন মধ্য বয়সী মেয়ের জন্য ভোদন যোগ্য পাত্র।

নিমাইয়ের চায়ের দোকানে বসে আড্ডা মারাই ভোদনের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। কেউ এলে ভোদন বলে, নিমাই খুব ভালো করে মালাই চা বানিয়ে পরিবেশন করো। সাথে একটি নিমকি অথবা সিংড়া।খাওয়া শেষে ভোদন বলে, এই নিমাই বিল কত হয়েছে? বিলের টাকা এসে নিয়ে যা। কিন্তু ওই বলা পর্যন্ত। আসলে এটা ভোদনের চালাকি। খেয়েই যাবে কিন্তু বিলের টাকা দেবেনা।

ভোদন সকালে বাজারের মুদির দোকানে যেয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার পর মূল্য পরিশোধের জন্য পকেট হাতড়িয়ে দেখে মানিব্যাগ নেই।ওরে আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। হারামজাদা পকেটমার আমার পকেট কেটে মানিব্যাগ নিয়ে গেছে। এখন তার কী হবে? একথা বলে ভোদন খুব জোরেশোরে হা-হুতাশ করতে থাকে। ভোদনের অবস্থা দেখে বেচারা দোকানী বলে, ঠিক আছে ভাই পরে টাকা দেবেন। আসলে ভোদনের কোনো মানিব্যাগ চুরি হয়নি। টাকা না দেওয়ার জন্য ভোদনের এটা একধরনের চালাকি। এরপর অন্তত দু’মাস ভোদন আর ওই পথে পা বাড়াবে না।

টাকা ধার নেওয়া ভোদনের রীতিমতো অভ্যেস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য কেউ তার সামনে পড়তে চায়না। পড়লেও এড়িয়ে যায় কিংবা উল্টোপথে হাঁটা শুরু করে। সেদিন রহিম চাচার সাথে দেখা হতেই ভোদন মায়ের অসুস্থতার কথা বলে কিছু টাকা ধার নিয়ে মনের সূখে গান গাইতে গাইতে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। আর রহিম চাচার সামনে পড়েনা। আসলে তার মায়ের কোনো জ্বর হয়নি। অসুস্থতার কথা বলে রহিম চাচার কাছ থেকে চালাকি করে কিছু টাকা হাতিয়ে নেয়।

ভোদন হঠাৎ খুব সিরিয়াস হয়ে যায়। সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকে। কী ব্যাপার, ভোদনের হলো কী? কী আর হবে। ভোদনের নাকি চাকরি হবে। কিন্তু এজন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে না পারলে চাকরি হবেনা। তাই ভোদনের মন খুবই খারাপ। একথা শুনে পাড়ার সবাই চাঁদা করে টাকা তুলে ভোদনের হাতে দেয়। ভোদন চাকরির নাম করে টাকা হাতিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করে। একারনে ভোদন এলাকা থেকে সরে গিয়ে কক্সবাজারে প্রায় একমাস কাটিয়ে এসে নতুন গল্প শোনায়। ভোদন কেঁদে কেঁদে গ্রামবাসিকে বলে, চাকরির জন্য গিয়েও কোন লাভ হয়নি। দালাল তার সব টাকা মেরে তাকে জীবননাশের হুমকি দেওয়ায় সে কোনোরকমে পালিয়ে বেঁচে এসেছে।

ভোদন প্রেমে পড়ে। তার প্রেমিকা তালাকপ্রাপ্তা মহিলা এবং চার সন্তানের জননী। ভোদনের চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। ভোদন সারাদিন মোবাইলে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রেমিকার সাথে কথা বলে। প্রেমিকার ইচ্ছানুযায়ী বিভিন্ন দোকান থেকে বাকি করে শাড়ি , কাপড়চোপড়, চুড়ি, প্রসাধনী ইত্যাদি অনেক কিছু কিনে পাঠায়। দিনদিন ভোদনের প্রেম বেড়েই চলে। এমনকি ভোদন ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া পযর্ন্ত করেনা। তাকে সবসময় গুনগুন করে গান গাইতে দেখা যায়। ইদানীং তাকে গায়ে পারফিউম মেখে এবং চোখে কালো চশমা পরে চলাফেরা করতে দেখা যায়। গ্রামের মুরুব্বিদের অনেকই মন্তব্য করে বলেন, যাক এবার তাহলে ভোদনের একাকিত্ব জীবন ঘুচতে চলেছে। অনেকে আবার মুখটিপে হেসে বলেন, টাকা কামানোর জন্য এটি ভোদনের নতুন কোনো কৌশল কিংবা ফন্দি না তো?

এভাবে চলার পর ভোদন হঠাৎ একদিন খুব সকালে নিমাইয়ের চায়ের দোকানে এসে হাজির। তাকে দেখে সবাই নড়েচড়ে বসে। ভোদন এমনিতে কালো কিন্তু আজ তাকে বেশি কালো দেখায়। তার মুখ দেখে বুঝা যায় কোনো একটি ঘটনা অবশ্যই ঘটেছে। কী রে ভোদন কেমন আছিস? তোর প্রেমিকার খবর কী? একজন মুরব্বির এ জিজ্ঞাসায় ভোদন একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, তাকে ছেড়ে তার প্রেমিকা আরেকজনের সাথে নিরুদ্দেশ হয়েছে। এঘটনার পর ভোদন সবসময় মনখারাপ করে বসে থেকে একটি গান হেড়ে গলায় খসখসিয়ে নীচুস্বরে গাইতো,… প্রেমের নাম বেদনা, সেকথা বুঝিনি আগে..। সে মুখভর্তি দাড়ি রেখে সবসময় পাগলের মতো রাস্তায় ঘুরতে থাকে। সমালোচকরা বলেন, ভোদন সবার সাথে চালাকি করলেও তার প্রেমিকা এবার তার ওপর চালাকি করেছে।

একদিন বিকেলে ভোদন পাড়ার প্রায় প্রতিটি বাড়িতে যেয়ে সালাম জানিয়ে বলে,তার কথায় এবং আচরনে কেউ যদি মনে কষ্ট পেয়ে থাকে তবে তাকে যেন সবাই ক্ষমা করে দেয়। তার এধরনের আচরনে সবাই আশ্চর্য হয়ে ভাবেন, হয়তো ভোদন বিদায় নিয়ে কোথাও চলে যাচ্ছে। অনেকে হাসহাসি করে বলেন, এটা হয়তো ভোদনের নতুন কোনো চালাকি। ভোদন কারো কথায় কর্নপাত না করে পাড়ার সবার কাছ থেকে একে একে বিদায় নিতে থাকে।

পরেরদিন সকালে ভোদন নিমাইয়ের দোকানে বসে সবাইকে চা- সিংড়া খাওয়ায়। দোকানে যারা আসে তাদেরকে খাওয়াতেই থাকে। তার এই পরিবর্তিত আচরনে সবাই অবাক হয়ে যান। কোনোকিছু বুঝে উঠতে পারেন না। অন্যান্য দিনের চেয়ে ভোদন আজ নিশ্চুপ, নীরব এবং বিমর্ষ।

এসময় পাড়ার রফিক সাহেবের ছোট ছেলে সুমন স্কুলে যাওয়ার জন্য রাস্তা পার হতে থাকে। সে স্হানীয় প্রাইমারী স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। রাস্তা পার হবার সময় হঠাৎ একটি ট্রাক দ্রুত গতিতে তার দিকে এগিয়ে আসে। এ ঘটনা দেখে সবাই একযোগে চীৎকার করে বলেন, সুমনকে মনে হয় আর রক্ষা করা গেলনা। মুখে হাহুতাশ করলেও কেউ তাকে রক্ষার জন্য এগিয়ে যায় না। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা সবাই হতভম্ব হয়ে কী করবে বুঝতে পারেনা। এসময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভোদন একদৌড়ে রাস্তার মাঝখানে গিয়ে সুমনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু নিজে সরতে না পেরে ট্রাকের নীচে পড়ে পিষ্ট হয়ে তখনই মারা যায়।এ অবস্হা দেখে সবাই ছুটে আসে। আজ আর কোনো চালাকি না করে ভোদন নিজের জীবনের বিনিময়ে সুমনকে রক্ষা করে।

ইতোমধ্যে পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজনসহ অনেকেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। তারা ভোদনের এই আত্মত্যাগের জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধাবোধ জানিয়ে কাঁদতে থাকে। ঘটনাস্থলে লোকে লোকারন্য হয়ে চারিদিকে শোকের ছায়া নেমে আসে। এতদিন যারা সবসময় ভোদনের সমালোচনায় মুখরিত ছিল তারাও আজ ভোদনের আত্মত্যাগের জন্য আহাজারি করে চোখের পানি ফেলতে থাকেন। সুমনের মা বলেন, যুগে যুগে এদেশে যেন ভোদনের মতো লোক জন্মায়। তার মতো লোক এযুগে পাওয়া মুশকিল যে কিনা তার একমাত্র সন্তান সুমনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে। ভোদনের এই আত্মত্যাগ ওই এলাকায় অনন্তকাল ধরে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536