ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম এর”রক্তের বন্ধন”

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম এর”রক্তের বন্ধন”

জানালার কাছে যেতেই পাশের দোতলা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির সাথে আবিরের চোখাচোখি হয়। মেয়েটিও তাকিয়ে নিমিষেই সরে যায়। এরপর প্রায়ই আবিরের সাথে মেয়েটির দেখা হয়েছে। মেয়েটিকে দেখে কেন জানি আবিরের খুব ভালো লাগে। তাই সে মাঝে মাঝে জানালার দিকে তাকায়, উদ্দেশ্য মেয়েটিকে একনজর দেখা। স্বপ্নচারী তরুনের মতো তার মাঝে সে ভালোলাগা খুঁজে পেয়েছে।

আবির স্হানীয় কলেজে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স নিয়ে পড়াশোনা করে। মেয়েটিও ওই কলেজের একই ক্লাসের ছাত্রী। সুন্দরী এবং বড়লোকের মেয়ে বলে সে খুবই আত্ম অহংকারী। কথা বলা তো দূরের কথা, কারো সাথে মিশতেই চায় না। বিশেষ করে গরিবদের সাথে। তার মতে, এতে নাকি সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়। তাই প্রতিবেশী হওয়া সত্বেও আবিরকে কখনও সে তার সাথে মেলামেশা এবং কথা বলার যোগ্য মনে করেনি।

আবির মেধাবী ছাত্র। দেখতে সুন্দর , ভদ্র ও নম্র বলে এলাকায় বেশ পরিচিত। কিন্তু গরিব বলে অনেকেই তাকে এড়িয়ে চলে। বিশেষ করে পাশের বাড়ির শাওন নামের মেয়েটি। গত একবছরে শাওনের সাথে প্রতিদিনই দেখা হয়েছে কিন্তু কখনও কথা হয়নি। আবির কয়েকবার চেষ্টা করেও শাওনের কাছ থেকে কোনো সাড়া পায়নি। বরং বিরক্ত হয়ে অনেক সময় কটু বাক্য বলে শাওন তাকে অপমান করেছে। ইতোমধ্যে মেধাবী ছাত্র হিসেবে আবির কলেজের সবার কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, ব্যতিক্রম শুধু শাওন। গরিব বলে তাকে পাত্তাই দেয়না। গরিব হয়ে জন্ম নিয়ে আবির যেন মস্তবড় অপরাধ করেছে। শাওনের কাছে এ অপরাধের যেন কোনো মার্জনা নেই।

এইতো সেদিন শাওনের জন্মদিন উপলক্ষে পাড়ার সব লোককে আমন্ত্রণ করা হলেও গরিব বলে আবিরসহ কয়েকটি পরিবারকে জানানো হয়নি। বন্ধুরা ভেবেছিল প্রতিবেশী এবং ক্লাসমেট হওয়ার কারনে শাওন হয়তো আবিরকে তার জন্মদিনে আমন্ত্রণ জানাবে। কিন্তু তা হয়নি। শাওনের মতে, ওইসব হতদরিদ্র ছেলে এলে অনুষ্ঠানের মর্যাদা শুধু ক্ষুন্নই হবেনা বরং অতিথিদেরকে অসন্মান ও অপমানিত করা হবে। দুপুরে খাওয়ার সময় মা আবিরকে দুঃখ করে বলেন – বাবা আবির,আমরা না হয় গরিব। কিন্তু তুই তো শাওনের সাথে এক ক্লাসে পড়িস। তোকে কী সে তার বাসায় যেতে বলেনি? আবির প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বলে, মা অনেকদিন খাইয়ে দাওনি। আজ তুমি আমকে খাইয়ে দেবে। মা বিষয়টি বুঝতে পেরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবিরকে খাওয়াতে থাকে। খাওয়ার একপর্যায়ে আবির বলে – মা , তোমার হাতে খেতে কত যে তৃপ্তি। এটা কী অন্য কোথাও পাওয়া যাবে? শুনে মায়ের দু’চোখ পানিতে ভরে যায়। মা বুঝতে পারেন শাওন তাকে দাওয়াত না করায় সে কষ্ট পেয়েছে। মুখে কিছু না বললেও তার চেহারায় সেটা প্রকাশ পেয়েছে।

কয়েকমাস পর একমাত্র বোনের বিয়েতে মায়ের ইচ্ছেনুসারে আবির নিজেই বিয়ের কার্ড নিয়ে শাওনদের বাসায় যায় এবং শাওনের হাতে দিয়ে বাসার সবাইকে দাওয়াত করে। হাতে নিয়েই শাওন বিয়ের কার্ডটি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবিরকে উদ্দেশ্য করে বলে, গরিবদের শখ থাকা ভালো কিন্তু তার একটা সীমা থাকা দরকার। আবির কোনো কথা না বলে মুখ বুঁজে সবকিছু সহ্য করে। ব্যথিত হৃদয়ে অপমানের তীব্র জ্বালা নিয়ে বাসায় ফিরতেই মা বলেন, কিরে শাওনরা আসবে তো? মায়ের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে আবির সোজা তার ঘরে যায়। মা বুঝতে পারেন, শাওন হয়তো তাকে অপমান করেছে। মা দ্রুত আবিরের ঘরে যেয়ে পাশে বসে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেন – বাবা আবির, আমারই ভুল হয়েছে। তুই যেতে চাসনি। আমিই জোর করে তোকে পাঠিয়েছি। একথা শুনে আবির মায়ের হাত জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, না মা তুমি কোনো ভুল করনি। তুমি প্রতিবেশীর হক আদায় করেছো। এরপর আবির আর কখনও কথা বলা তো দূরে থাক, শাওনের দিকে ফিরেও তাকায়নি।

কিছুদিন পরের কথা, একদিন সকালে শাওনদের বাসা থেকে কান্নার শব্দ শুনে দ্বিধাদ্বন্দ ভুলে আবির দ্রুত সেখানে যায়। দারোয়ানের কাছে জানতে পারে, ওই বাসার একমাত্র মেয়ে শাওন শহরে গিয়ে গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে মৃত্যুশয্যায়। জরুরি ভিত্তিতে তার শরীরে অপারেশনের জন্য রক্তের প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতাল, ব্লাড ব্যাংক ইত্যাদি কোথাও তার গ্রুপের রক্ত পাওয়া যাচ্ছেনা। মেয়েটির বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনরা মরিয়া হয়ে পাগলের মতো রক্তের সন্ধান করছেন। রক্ত ছাড়া তাকে বাঁচানো সম্ভব হবেনা।

ঘটনা শুনে আবির দেরি না করে সব অভিমান ভুলে গিয়ে মাকে জানিয়ে তৎক্ষনাত হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সেখানে গিয়ে দেখতে পায় শাওনের বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনরা আহাজারি করে কান্নাকাটি করে যাচ্ছেন। কোনোভাবেই রক্ত জোগাড় করতে পারছেন না। রক্তের গ্রুপের সাথে মিল থাকায় আবির দেরি না করে ডাক্তারকে জানিয়ে শাওনকে তার শরীর থেকে দু’ব্যাগ রক্ত দেয়। অপারেশন থিয়েটারে তিনঘন্টা সফল অপারেশনের পর শাওনকে কেবিনে আনা হয়। আবিরের রক্তের কারনে শাওনকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে বলে ডাক্তার জানালে মেয়েটির বাবা কৃতজ্ঞতায় আবিরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলেন, বাবা তুমি আমার মেয়েকে বাঁচিয়েছো। তোমার এ ঋৃন শোধ করবো কীভাবে? আমরা যে তোমার কাছে চিরঋণী হয়ে গেলাম। এসময় শাওনের মা অশ্রুসজল চোখে আবিরের মাথায় হাত বুলিয়ে প্রানভরে দোওয়া করেন।

সুস্থ হয়ে শাওন জানতে পারে যে, পাশের বাসার অবহেলিত গরিব ছেলে আবির তাকে রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে তুলেছে। শুনে শাওনের দু’চোখ থেকে অজস্র ধারায় অস্রু গড়িয়ে পড়ে। ভাবে, গরিব বলে তাকে সে কতই না অবহেলা, অপমান এবং অপদস্ত করেছে। অথচ তার দেয়া রক্তে সে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। মনে মনে সে অনুশোচনার আগুনে পুড়তে থাকে। আবিরের সাথে দেখা করার জন্য সে উতলা হয়ে ওঠে।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শাওন বাসায় না গিয়ে অনেক তৃপ্তির আভা নিয়ে জোছনার আলো ছড়িয়ে সরাসরি আবিরদের বাসায় যায়। আবির তাকে দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে। বিস্ময়ের রেশ কাটতে না কাটতেই ঘন মেঘের চাদর সরিয়ে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে শাওন এগিয়ে যায়। মিষ্টি হেসে আবিরের হাতে একটি গোলাপ ফুল দিয়ে ক্লান্ত করুন চোখে কানে কানে বলে , তুমি যে আমার চিরদিন। হৃদয় উজাড় করে দু’জনাই জড়িয়ে পড়ে ভালোবাসার অবিচ্ছেদ বন্ধনে। তাদের চোখে রাশি রাশি স্বপ্ন আর আশা। প্রানে আনন্দের অফুরন্ত সমাহার।

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536