ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম এর “টোকাই”

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম এর “টোকাই”


টোকাই , বয়স অনুমান ১২ বছর। তার কোনো নাম নেই। সবাই তাকে এ নামেই ডাকে। কারন তার বাবা-মা কোনো নাম রাখেনি।জন্মের আগেই বাবা তার মাকে ছেড়ে আরেকজনের সাথে ঘর বাঁধে।জন্মের পর মা তাকে রাস্তার ডাস্টবিনে ফেলে রেখে আরেকজনকে বিয়ে করে আলাদাভাবে থাকে। একজন ফকির রাস্তায় ভিক্ষা করার সময় তাকে দেখতে পেয়ে কুড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে পালতে থাকে। ফকিরকেই সে বাবা বলে ডাকতো। তার এই বাবাই তার নাম রাখে টোকাই। কিন্তু এখানেও তার সূখ সয় না। তার বয়স যখন ৫ বছর তখন তার ফকির বাবা মারা যায়।

এরপর টোকাইকে বস্তির এক দাদি বড় করতে থাকে। দাদি তাকে রাস্তায় টোকাইয়ের কাজ শেখায়।কিন্তু দুঃখ যার জীবনের সাথে জড়িত তার আবার সূখ কী? এক বছরের মাথায় সামান্য জ্বরে টোকাইয়ের দাদি মারা গেলে টোকাইয়ের জায়গা হয় রাস্তার ফুটপাতে। এ অবস্হা দেখে পাড়ার এক লোক টোকাইকে তার বাড়িতে নিয়ে কাজের ছেলে হিসেবে নিয়োগ দেয়। কিন্তু এখানেও টোকাই বেশিদিন থাকতে পারেনা। গৃহকর্ত্রীর নির্মম নির্যাতন সইতে না পেরে সে পালিয়ে যায়। আবার তার জায়গা হয় রাস্তায়।

রাস্তায় ঘুরতে দেখে একদিন এক লোক টোকাইকে তার হোটেলে থালাবাসন ধোওয়ার কাজ দেয়। বিনিময়ে তার কপালে জুটে থাকার জায়গা এবং খাবার । কিন্তু এখানেও সে বেশিদিন থাকতে পারেনা। ধোওয়ার সময় পরপর দু’দিন হাত ফসকে পড়ে দুটি কাঁচের গ্লাস ভেঙে যাওয়ায় হোটেল মালিক তাকে মারধর করে হোটেল থেকে তাড়িয়ে দেয়।

এরপর থেকে টোকাই রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ডাস্টবিনের ময়লা আবর্জনা থেকে খালি বোতল, ক্যান, পলিথিন ইত্যাদি কুড়িয়ে জমা করে। পরবর্তীতে তা বিক্রি করে যা পায় তা দিয়ে ফুটপাতের হোটেল থেকে খাবার কিনে খেয়ে জীবন ধারন করে। রাতে সে কখনও রেলস্টেশন আবার কখনও বাসটার্মিনালের এককোনে মাটিতে পুরনো খবরের কাগজ বিছিয়ে শুয়ে থাকে। টোকাই কখনও কারো কাছে হাত পাতেনা। উপার্জন হলে খায়, নাহলে উপোষ থাকে। কেউ কিছু দুতে চাইলে সে বিনয়ের সাথে তা ঘুরিয়ে দেয়। মনে মনে বলে, সে কারো দয়া চায় না। কিন্তু সবার প্রতি সে দয়াবান। যদিও তার বাবা-মা তার প্রতি কোনো দয়া দেখায়নি। বরং তাকে ফেলে পালিয়ে গেছে। বাবা- মা বেঁচে থাকতেও সে এতিম। ছেলে-মেয়েরা যখন তাদের বাবা-মায়ের হাত ধরে রাস্তা দিয়ে যেতে থাকে তখন তা দেখে টোকাইয়ের মন খুব খারাপ হয়ে যায়। সে ভাবে, বাবা- মায়র সাথে থাকলে সেও এভাবে তাদের হাত ধরে হাটতো। কখনও মায়ের আবার কখনও বাবার কোলে চড়তো। মাঝে মাঝে পার্ক ও চিড়িয়াখানা বেড়াতে যেত। লেখাপড়া শিখতো। দিনগুলি কতই না সূখের হতো।

ঈদের দিন টোকাইয়ের মন খুব খারাপ হয়ে যায়। তার বয়সি ছেলে-মেয়েরা নতুন জামাকাপড় পরে কত আনন্দ করে। খুশিতে ছুটোছুটি করতে থাকে। অথচ তার গায়ে পুরনো ময়লা জামাকাপড়। সারাদিন সে কোথাও না গিয়ে চুপচাপ রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে শুয়ে থাকে। আগে থেকে কিনে রাখা বাসি পাওরুটি আর গুড় খেয়েই দিন কাটিয়ে দেয়। তার ছোট্ট মনে বয়ে যায় অনেক দুঃখ আর বেদনা। মনে মনে ভাবে, কেন তার এই দুরাবস্থা। কেন তার বাবা- মা তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে? তার মনও চায় বাবা- মায়ের আদর আর স্নেহ পেতে। বাবা- মায়ের হাতে খেতে। কিন্তু জন্মের পর সে তো মায়ের বুকের দুধও খেতে পায়নি। কেন মা তাকে ফেলে পালিয়ে গেছে? কেন জন্মের আগে তাকে ফেলে বাবা পালিয়ে গেছে? সেকি তাদের কাছে খুব বোঝা হয়ে গিয়েছিল? বাবা-মায়ের মুখ দেখার জন্য তার মন খুব কাঁদে। কিন্তু আফসোস সে কোনোদিন তার বাবা-মায়ের মুখ দেখতে পাবেনা। চিরকাল তারা অচেনা হয়েই থাকবে। বাবা-মায়ের কথা ভেবে তার দু-চোখ অশ্রুতে ভরে যায়। নীরবে অনেকক্ষন কাঁদে। মনে মনে বলে, বাবা-মা আমি কী অপরাধ করেছিলাম যার জন্য তোমরা বেঁচে থাকতেও আমাকে এতিম করে দিয়েছ ? আমি তো সারাজীবন তোমাদের খোঁজ পাবো না। কাউকে বাবা-মা বলে ডাকতেও পারবো না। কেন এমন হলো?

টোকাই রাস্তায় যখন তার বয়সি ছেলে-মেয়েদের বইয়ের ব্যাগ হাতে স্কুলে যেতে দেখে তখন তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। তারও স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়। ইস্ বাবা-মায়ের সাথে সে যদি থাকতে পারতো তবে সেও লেখাপড়া করতো। এভাবে বইয়ের ব্যাগ হাতে স্কুলে যেত। এসব কথা চিন্তা করে সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে। একমনে ভেবেই চলে, পৃথিবীতে তার মতো হতভাগা মনে হয় আর কেউ নেই। অশ্রুসজল চোখে ছেলে-মেয়েদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ভেবেই চলে। তার ভাবনার যেন শেষ নেই।

টোকাইকে এলাকার সবাই ভালোবাসে। বিপদে-আপদে সে সবাইকে শ্রম দিয়ে সাহায্য করে।বিনিময়ে কিছুই নেয় না। রাস্তায় যদি কোনো চালকের মোটর সাইকেল নষ্ট হয়ে যায় তবে সে মেকার ডেকে এনে সাহায্য করে। রিকশা আটকে গেলে তা ঠেলতে রিকশাওয়ালাকে সাহায্য করে। রাস্তায় কেউ অসুস্থ হলে তাকে ডাক্তারখানায় নিয়ে যায়। বয়স্ক লোক এবং শিশুদের রাস্তা পারাপারে সহায়তা করে। তার এসব কর্মকাণ্ডের জন্য এলাকার লোকজন তাকে খুব পছন্দ করে। সে এতটাই জনপ্রিয় যে, তাকে কোনোদিন রাস্তায় দেখা না গেলে লোকজন বলে, টোকাই আসেনি

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536