বিশিষ্ট নাট্যকার ও অভিনেতা জনাব আরিফুল হক এর লেখাটি প্রকাশের উদ্দেশ্যে।

বিশিষ্ট নাট্যকার ও অভিনেতা জনাব আরিফুল হক এর লেখাটি প্রকাশের উদ্দেশ্যে।

মহসিন মুন্সি: বিশিষ্ট নাট্যকার ও অভিনেতা জনাব আরিফুল হক এর লেখাটি প্রকাশের উদ্দেশ্যে 
“জান দিয়ে জানোয়ার পেলাম”
আরিফুল হক(সাবেক নাট্যকার)
বড় মনোঃকষ্ট নিয়ে এই শিরোনামটি লিখলাম। অনেক রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশ। শুনি ৩০ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশ! এই কি সেই বাংলাদেশ! বার্ধক্যে এসে চিনতে পারছিনা দেশটাকে, চিনতে পারছিনা দেশের মানুষগুলোকে!
এই কি সেই বাংলাদেশ, যেখানে ১২০৩ সালে মুসলিম সেনাপতি মালিক ইখতিয়ার উদ্দিন মহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে মাত্র ১৭জন ঘোড়সওয়ারী বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে মুসলিম রাজ্যের গোড়া পত্তন করেছিলেন!
এই কি সেই বাংলাদেশ, যেখানে ইসলামের অন্তর্নিহিত মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে, ইসলামকে নির্যাতিত মানবাত্মার মুক্তিসনদ এবং সাম্য ও ন্যায়বিচারের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বিবেচনা করে সেকালের হিন্দু-বৌদ্ধরা দলে দলে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নেবার জন্য ছুটে এসেছিলেন! শুধু অশিক্ষিত অসবর্ণরাই নয়, শিক্ষিত ব্রাহ্মণ কায়স্থরাও ইসলামের আদর্শকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইতিহাসে এর অসংখ্য নজীর রয়েছে!
যোগী ব্রাহ্মণ ভোজ-রাজ, কাজী রুকনউদ্দিন সমরকন্দীর কাছে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন! ব্রাহ্মণ  রাজা গনেশের পুত্র যদু ইসলাম গ্রহণ করে হয়েছিলেন জালালউদ্দীন মুহাম্মাদ শাহ। সোলায়মান ও দাউদ খানের সেনাপতি সুবিখ্যাত ‘কালাপাহাড়’ কায়স্থ থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছিলেন। বার ভূঁইয়া খ্যাত ঈসা খাঁ’র পিতা কালিদাস গজদানী, ক্ষত্রিয় রাজপুত থেকে ইসলাম কবুল করে সোলায়মান নাম ধারণ করেছিলেন। সুবে বাংলার স্বাধীন নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ ছিলেন দাক্ষিণাত্যের হিন্দু ব্রাহ্মণ। এমন হাজারো উদাহরণ দেয়া যায়, যারা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ইসলামের ছায়াতলে এসে নিজেদের গৌরবান্বিত মনে করতেন। সেই বাংলাদেশের আজ একি চেহারা !
এই কি সেই বাংলাদেশ, যে দেশের তুলা উৎপাদন এবং মসলিন কাপড় জগদ্বিখ্যাত ছিল! যে দেশের চাল উৎপাদন সম্পর্কে ফরাসী পর্যটক বার্নিয়ার মন্তব্য করেছিলেন, “বাংলায় এত বেশি চাউল উৎপন্ন হয় যে, উহা কেবল প্রতিবেশী দেশগুলিতেই নয়, দূরবর্তী দেশগুলিতেও রপ্তানি করা হয়।”
অত দূরেই বা যাওয়ার দরকার কি? এই তো সেদিন ১৯৫০ সালের দিকেও এদেশের পাট শিল্প এত সমৃদ্ধ ছিল যে, নারায়ণগঞ্জকে বলা হতো ‘ডান্ডি অফ দ্য ইস্ট’। ১৯৪৯ এর দিকে এই বাংলাদেশকে বলা হতো ‘Home of the world’s largest Tea plantation’। সেদিনও এদেশে ২০ টাকা মন চাল ছিল, ১৮ টাকা মন আটা, ৫ টাকা সের সরিষার তেল, ৫ টাকায় শাড়ী, ৩ টাকায় লুঙ্গী, ৭ টাকায় লাঙ্গল, ৬ টাকায় কোদাল, মাত্র ১৫ টাকায় কাফনের কাপড়। মাছ ওজন করে বিক্রি হয়, এ কথা মানুষের ধারণাতেই ছিলনা। চট্টগ্রামের মুরগী আর ঢাকার মাছ ছাড়া কলকাতার বাজার অচল হয়ে পড়তো। এদেশের মুদ্রার মান পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চাইতে সবসময় অধিক ছিল। আজ এসবই অতীতের কিংবদন্তী বলে ভ্রম হয়। কেন এমন হলো? অপদার্থ নেতারা বলেছিলেন সোনার বাংলা গড়ে দেবেন! এই কি সেই সোনার বাংলার চেহারা?
বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস জুড়ে আজ একটা আওয়াজই ধ্বনিত হচ্ছে, তাহলো ‘সংকট’। খাদ্য সংকট, বস্ত্র সংকট, আবাসন সংকট, চিকিৎসা সংকট, শিক্ষা সংকট, চাকুরী সংকট, দ্রব্যমূল্য সংকট , জ্বালানী সংকট, বিদ্যুৎ সংকট, গ্যাস সংকট, পরিবহণ সংকট, আইন-শৃঙ্খলা সংকট, হাজারো সংকটে প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকাটাই আজ সংকট হয়ে উঠেছে। তার উপর আছে এক শ্রেণীর নেতা-নেত্রীর অবাধ লুটপাটে দেশের জনগণের অর্থনীতি ফাঁকা ফোঁপরা হয়ে যাওয়ার সংকট।
স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে ‘ভোট’ শব্দটিই উঠে গেছে। ভোট এখন হাতলওয়ালা মেশিনের মত। হাতল ঠিকমত ঘুরাতে পারলেই ভোট নিজের বাক্সে এসে পড়বে। আর একবার নির্বাচিত হতে পারলে টেনে নামায় কার সাধ্য! সুতরাং জনসাধারণের সেবা করার দরকার কী, কিছু সেলসম্যান, মাসলম্যান, বন্দুকম্যানদের সেবা করে হাতে রাখতে পারলেই জনগণ ঠাণ্ডা। জনগণকে যা গেলানো হবে তাই গিলতে হবে, না গিললে বাঁশ দিয়ে গেলানো হবে। এমনি এক স্বৈর শাসকের হাতে বাঁধা পড়ে আছে দেশের জনগণ।
 যে শাসক জনগণ কে ‘পদ্মা-মেঘনা’ বোঝাবার জন্য দুটি পদ্ধতির অনুসরণ করছে। একটি ‘থিওরিটিক্যাল’ অন্যটি ‘প্র্যাকটিক্যাল’। থিওরিটিক্যাল পদ্ধতিটি হলো, মুখে মুখে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিতে হবে, প্রতিশ্রুতি দেবার বেলায় মুখে লাগাম দেয়া চলবেনা। সবসময় বলতে হবে ‘আমি দিচ্ছি’ বা ‘আমি দেবো’। বন্যার ত্রাণেও লেখা থাকবে আমার নাম! মনে হয় যেন পিতৃ সম্পত্তি থেকে খয়রাত দেয়া হচ্ছে। আর সেলসম্যানদের মাধ্যমে জোরেশোরে প্রচার করতে হবে অতীতে কোনই উন্নয়ন হয়নি, বর্তমানে উন্নয়নের জোয়ার বইছে!
প্রাকটিক্যালি হবে ঠিক উল্টো। কাজীর গরু কেতাবে থাকবে, গোয়ালে থাকবেনা। উন্নয়ন থাকবেনা, কমিশন বাণিজ্য আর লুটপাট থাকবে। পুল থাকবেনা, ফিতা কাটার আগেই ভেঙ্গে পড়বে। পানি থাকবেনা, হাড়ি-কলসীর লাইন থাকবে। বিদ্যুৎ থাকবেনা গ্যাস থাকবেনা, বিরাট অংকের বিল থাকবে। রাস্তা বাড়বেনা মানুষ গাড়িঘোড়া বাড়বে। দুর্নীতিকারী, ঘুষখোর, চোরাচালানী ভেজালকারী, মাদকব্যবসায়ী, ব্যাংক-লুটেরা, খুনী, টাকা পাচারকারীরা সম্মানিত হবে, সম্মানিত দেশপ্রেমিকদের অসম্মান করে দেশছাড়া করা হবে। বড় কাজ করার থেকে বড় ভান করাই হবে উন্নয়নের মাপ কাঠি। 
অথচ আমরা গর্ব করে বলি ৩০ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের এই মহান স্বাধীনতা। যৌবনে কোলকাতায় থাকাকালীন ‘গণনাট্য সংঘ’ এর একটা গান গাইতাম, গানের শুরুটা ছিল এরকম-
“নাকের বদলে নরুন পেলাম তাক ডুমাডুম ডুম,
জান দিয়ে জানোয়ার পেলাম লাগলো দেশে ধুম!” 
স্বাধীনতার বেহাল দশা দেখে আজ এই গানটির কথা বারবার মনে পড়ছে।
মুক্তিযুদ্ধে আমারও অবদান কম ছিলনা। আজ মনে হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ মাঝপথে ছিনতাই হয়ে গেছে। নইলে এ কেমন মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, যেখানে আমাদের দুশমনরা, ভারতের প্রতিপক্ষ হয়ে গেল। যুদ্ধ করলাম আমরা, কমান্ডার হলো ভারতীয় জেনারেল অরোরা। আমাদের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব, আমাদের কমান্ডার জেনারেল ওসমানী সহ গোটা বাংলাদেশ হয়ে গেল ভারতীয় জেনারেল অরোরার অধীন। যুদ্ধ করলাম আমরা, রক্ত দিলাম আমরা, আমাদের মা বোনেরা সম্ভ্রম হারালো, অথচ পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করলো ভারতীয় বাহিনীর কাছে, অর্থাৎ জেনারেল অরোরার কাছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার জেনারেল ওসমানীকে উপস্থিত থাকতেও দেয়া হলোনা। পাকিস্তান বাহিনী হত্যা করলো আমাদের নিরীহ মানুষদের, ইজ্জত লুট করলো আমাদের মা-বোন দের, আমরা চিহ্নিতও করলাম যুদ্ধাপরাধীদের, অথচ বিচার করতে পারলাম না। ভারত নিজ দায়িত্বে তাদের মুক্তি দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দিলো, আমাদের মতামত নেয়ারও প্রয়োজন মনে করলো না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যারা ময়দানে লড়াই করেছিল তাদের বেশির ভাগ ছিল কৃষক শ্রমিক, প্রভৃতি খেটে খাওয়া মানুষ, বাদবাকি ছাত্র, সেনাবাহিনী সদস্য, বিডিআর, পুলিশ, আনসার প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছে তাদের ৩৪% ছিল খেটে খাওয়া মানুষ। অথচ যুদ্ধ শেষে ভারতের কৃপায় যারা ক্ষমতা দখল করলো, তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসে আরাম-আায়েশে দিন কাটাচ্ছিলেন। এদের সাহায্যেই ধূর্ত ভারত, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিনতাই করে নেয়, এদের সাহায্যেই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরিবর্তে ভারতের কলোনিয়াল দেশে পরিণত হয়।
আজ মনে হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পূর্ণ হয়নি। দেশ সেই অসম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ সম্পূর্ণ করার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে। দেশের ডাকে সাড়া দিন। সকল বিভেদ ভুলে ১৭ কোটি মানুষ এক কাতারে সমবেত হন। যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি দিন। সামনে ভারত নামক ভয়াবহ দানব-শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে, যে সাপের চেয়েও খল, কুমীরের চেয়েও হিংস্র। অবসরের সময় নেই।
জিন্দাদিল কবি, কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলতে চাই-
“রক্ত মাংস খেয়েছে তোদের  কঙ্কাল শুধু আছে বাকি
ঐ হাড় নিয়ে উঠে দাঁড়া তোরা ‘আজো বেঁচে আছি বল ডাকি!’

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536