শারদীয় দুর্গোৎসব : বাঙালির সর্বজনীন উৎসব

শারদীয় দুর্গোৎসব : বাঙালির সর্বজনীন উৎসব

“নয়ন দেব নাথ”

শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালির হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে কালের পরিক্রমায় এটি এখন আর কেবল নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুর্গাপুজো এখন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সর্বজনীন উৎসব। শুধু ধর্মীয় দিক থেকে নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এ উৎসব অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। নির্দিষ্ট ধর্ম বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে সূচনা হলেও উৎসব এর রূপ নিয়ে দুর্গাপুজো হয়ে ওঠেছে সব সম্প্রদায়ের সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সেতুবন্ধকে সুদৃঢ় করার এক অনন্য সামাজিক উৎসব।

বছরে সাধারণত তিনবার দেবী দুর্গার পুজো হয়। যেমন শরতে শারদীয় দুর্গার, বসন্তে বাসন্তী দুর্গার এবং হেমন্তে কাত্যায়নী দুর্গার। তবে আদিতে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হত বসন্ত কালে। একে বলা হতো বাসন্তী পুজো। পুরাণ মতে, সত্যযুগে রাজা সুরথ নিজ পাপ মোচনের জন্য বসন্তকালে দুর্গাপুজো করেছিলেন। মহাভারতের ভীষ্মপর্বেও উল্লেখ আছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে জয়লাভের জন্য শ্রী কৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধ শুরুর আগে দেবী দুর্গার স্তব করার উপদেশ দিয়েছিলেন। শরৎ কালে দুর্গা পুজোর সূচনা হয় মূলত: রামায়নের কাহিনীকে অবলম্বন করে। ত্রেতা যুগে রাক্ষস রাজা রাবণকে বধ ও সীতাকে উদ্ধারের জন্য শ্রী রাম চন্দ্র শরৎ কালে (অকালে) দেবী দুর্গার পুজো করেছিলেন। অকালে হয়েছিল বলেই এর আরেক নাম অকাল বোধন। বাংলাদেশে শরৎ কালের দুর্গাপুজোই সবচেয়ে বেশী প্রচলিত। কৃষিভিত্তিক বাঙালি সমাজ শরৎকালকেই দুর্গোৎসবের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে বেছে নিয়েছে।

এ উপমহাদেশে কোথায় প্রথম দুর্গা পুজো হয় তার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। অনেকের ধারণা বর্তমানে যে পদ্ধতিতে দুর্গাপুজো হয় তার সূত্রপাত হয়েছিল চতুর্দশ শতাব্দী বা এরও কিছু আগে। আবার কারও কারও মতে বাঙালি হিন্দুর দুর্গাপূজা শুরু হয় ষোড়শ শতাব্দীতে। বৃন্দাবন দাসের চৈতন্য ভাগবত এ দুর্গোৎসবের কথা বর্ণিত হয়েছে এভাবে মৃদঙ্গ মন্দিরা শঙ্খ আছে সর্বঘরে/দুর্গোৎসবকালে বাদ্য বাজাবার তর। এতে প্রমাণিত হয় ষোড়শ শতকের আগেই দুর্গোৎসব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিল। অন্যদিকে মিথিলার কবি বিদ্যাপতি রচিত দুর্গা ভক্তি তরঙ্গিণী গ্রন্থেও সিংহবাহিনী দেবী দুর্গার পুজোর উল্লেখ রয়েছে। তাই বলা যার মিথিলাতেও ষোড়শ শতকের আগেই দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল। কিংবদন্তি আছে শ্রী হট্টের(বর্তমানে সিলেট) রাজা গণেশ পঞ্চদশ শতকে মূর্তি দিয়ে দুর্গা পুজো করেন। এছাড়া ষোড়শ শতকে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ তার রাজ পুরোহিত পন্ডিত রমেশ শাস্ত্রীর বিধান অনুযায়ী প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে মাটির মূর্তি দিয়ে জাঁকজমকভাবে দুর্গোৎসব পালন করেন। পরবর্তীতে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাদুরিয়ার রাজা জগৎ নারায়ণ সাড়ে নয় লাখ টাকা ব্যয়ে উদ্যাপন করেন বাসন্তী দুর্গাপুজো। অষ্টাদশ শতকে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র্র এবং পরবর্তীতে তার উত্তরসূরীরাও সেই ঐতিহ্যকে রক্ষা করে চলেন। এভাবেই দুর্গাপুজো এক সময় হিন্দু রাজা-জমিদারদের মধ্যে এক ধরণের প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পড়েছিল নব্য ধনীদের মাঝেও। তবে দেবীর আরাধনার চেয়েও তাদের কাছে মূখ্য ছিল পুজোর মধ্য দিয়ে সমাজে প্রভুত্ব বিস্তার ও ঐশ্বর্য প্রদর্শনের বিষয়টি। কিন্তু বিশ শতকে এসে দুর্গোৎসবকে সর্বজনীন রূপ দিয়েছে বাঙালিরা। এ সময়ে ব্যক্তিগত পুজোর পাশাপাশি ব্যাপকভাবে প্রচলন ঘটতে থাকে বারোয়ারি বা সর্বজনীন দুর্গোৎসবের হাজার বছরের জাত-পাতের বিভেদ চুরমার করে দিয়েছে এ কালের সর্বজনীন দুর্গোৎসব। তথাকথিত উচু-নীচুদের মধ্যে রচনা করেছে মহা ঐক্যের ভিত। এ পুজোয় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও ভালবাসার এক অকৃত্রিম বন্ধনে মিলিত হয়। অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দেয় প্রতিটি বাঙালির হৃদয়।

প্রতিমায় দেবী দুর্গাকে নারী রূপে দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি নারী বা পুরুষ কোনটাই নন। পুরাণ মতে, তিনি এক অভিন্ন স্বত্ত্বা বা মহাশক্তি। সকল দেব-দেবীর সমন্বিত পরমাশক্তি। তিনি বহুরূপিনী। তিনিই ভগবতী, চন্ডী, উমা, পার্বতী এবং আদ্যশক্তি মহামায়া নামে পরিচিত। জীব ও জগতের কল্যাণের লক্ষ্যে একেক সময় তিনি একেক নামে বা রূপে মর্ত্যে আবির্ভূত হয়েছেন। আসলে তিনি আদি শক্তি, ব্রহ্ম সনাতনী। শক্তি অর্থে ব্রহ্মার মহাশক্তিকে বোঝায়। এ শক্তি অনাদি, অনন্ত। তার বিস্তৃতি সর্বব্যপী। সকল দুর্গতি বিনাশ করেন বলে তিনি দুর্গতি নাশিনী। দুঃখকে নাশ করেন বলে তিনি দুর্গা। আবার অনেকের মতে, স্বর্গ রাজ্যের শাস্তি বিনাশকারী দুর্গ নামক এক মহা পরাক্রমশালী দৈত্যকে বধ করার কারণে তিনি দুর্গা নামে অভিহিত। সে যা হোক শত্রুর কাছে তিনি সর্বদাই সংহাররূপিনী, আবার ভক্তের কাছে আনন্দময়ী, স্নেহময়ী জননী ও কল্যাণপ্রদায়িনী।

পুরাণ তন্ত্রানুসারে, দেবী দুর্গা তাঁর স্বামীগৃহ কৈলাস থেকে বছরের এই সময়ে সপরিবারে পৃথিবীতে বেড়াতে আসেন। তাঁর সঙ্গে আসেন চার সন্তান লক্ষ্মী, স্বরস্বতী, কার্ত্তিক ও গণেশ। লক্ষ্মী ধন-সম্পদের প্রতীক, স্বরস্বতী বিদ্যা-বিজ্ঞানদায়িনী, গণেশ সর্ব কাজের সিদ্ধিদাতা এবং কার্ত্তিক শৌর্যবীর্যের প্রতীক। এ যেন পৃথিবীর জন্য এক মহা আয়োজন। তাদের সকলের আগমণের উদ্দেশ্য জীব ও জগতের সুখ, শান্তি এবং অসুর-অশুভের বিনাশ। দুর্গার পদতলে পদদলিত থাকে অশুভের প্রতীক অসুর। সিংহের ওপর দাঁড়ানো দেবীর দশহাতে থাকে দশ অস্ত্র ত্রিশূল, খড়গ, চক্র, তীক্ষèবান, শক্তি, ঢাল, ধনু, পাশ, অংকুশ ও কুঠার। দশ হাতে দশ দিক রক্ষা করেন বলেই তিনি দশভূজা।

একটি আশার কথা, বাংলাদেশের শারদোৎসবে দিন দিন নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। প্রতিমা তৈরি, আলোক সজ্জা, তোরণ নির্মাণসহ সব কিছুতেই বেড়েছে এর জাঁকজমকতা। দেবীর আরাধনাকে শুধু ধর্মীয় আঙ্গিকে এবং পুজো ম-পের মাঝে আবদ্ধ না রেখে আমাদের যুব সমাজ এটিকে পরিণত করেছে সকল ধর্ম-মতের মানুষের সামাজিক উৎসব-এ। পুজোকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন ঢাক-ঢোলের বাদ্য-বাজনা ও আরতিনৃত্য চলে, তেমনি এর পাশাপাশি চলে নানা সামাজিক কর্মকা-ও। সব মিলিয়ে দুর্গোৎসব এখন সকল বাঙালির উৎসব। বাঙালি মাত্রই আপ্লুত হয় পুজোর আনন্দে।

লেখক : নয়ন দেব নাথ।

সংবাদ শেয়ার করুন

হযরত আলহাজ্ব শাহ মৌলানা হাফেজ আহমদ (রহঃ) শাহ্ সাহেব কেবলা চুনতী কর্তৃক প্রবর্তিত ঐতিহাসিক ১৯ দিন ব্যাপী সীরতুন্নবী (সঃ) মাহফিল এর ৫১তম মাহফিল উপলক্ষে চট্টগ্রাম শহরের প্রস্তুতি সভা ১২ অক্টোবর ২০২১ নগরীর রীমা কনভেনশন হলে আলহাজ্ব মাওলানা হাফিজুল ইসলাম আবুল কালাম আজাদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়।

পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন দারুন উলুম আলীয়া মাদ্রাসা ছাত্র সংসদ জিএস শেখ সুলতান রাফি। নাতে রাসুল সঃ পাঠ করেন তামজিদুর রহমান, আবদুল হাদি। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সমাজ সেবক ও চুনতী হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মাওলানা হাফিজুল হক নিজামী। হাজার হাজার আশেকানে ভক্তের উপস্থিতিতে যাহেদুর রহমান ও কশশাফুল হক শেহজাদ এর সঞ্চালনায় মাহফিল এর সফলতা ও সার্বিক সহযোগিতার প্রত্যাশা নিয়ে বক্তব্য রাখেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব এডিএম আবদুল বাসেত দুলাল, নির্বাহী কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাঈল মানিক, সিটি কর্পোরেশন প্যানেল মেয়র ও দেওয়ান বাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড, আবুল আলা মোহাম্মদ হোসামুদ্দীন, লোহাগাড়া সমিতি চট্টগ্রাম সভাপতি শফিক উদ্দিন, অলিউদ্দিন মোহাম্মদ, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাদাত জামান খান মারুফ, চুনতি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন জনু, তৈয়বুল হক বেদার, কাজি আরিফুল ইসলাম, আসমা উল্লাহ ইমরাত। এতে আরো উপস্থিত ছিলেন মোতোয়াল্লী কমিটির সদস্য আবু তাহের, মাহবুবুল হক, ইদ্রিস মিনহাজ, নির্বাহী কমিটির সদস্য ওবাইদুল মান্নান রোকন, প্রফেসর হামিদুল হোসেন ছিদ্দিকী, ওয়াহিদুল হক, মাওলানা জাফর সাদেক মিয়াজী, আবু হেনা টুটুল, চুনতি সমাজ কল্যাণ সম্পাদক এডভোকেট মিনহাজুল আবরার, মাওলানা কফিল উদ্দিন, মাওলানা এবাদুর রহমান, কামরুল হুদা, জয়নাল আবেদীন শবাব, মোহাম্মদ নাঈম নিমু, সাদুর রহমান, মাহমুদ জামান খান, আবদুল ওয়াহেদ সোহেল, শাহাদাত খান ছিদ্দিকী, ইব্রাহীম মোহাম্মদ, আরিফ ইয়াসির, আবরারুল হক মুকুট প্রমুখ। মীলাদ পরিচালনা করেন মাওলানা আবু দাউদ মোহাম্মদ শাহ শরীফ এবং মুনাজাত পরিচালনা করেন মোতোয়াল্লী কমিটির সদস্য আলহাজ্ব মাওলানা কাজী নাছির উদ্দিন। চুনতি ক্লাব সমূহ আনজুমান ই নওজোয়ান, শিকড়, দীপিত, নুরানী, চিরহরিৎ, নিরেট, প্রয়াস, অর্ণব, অগ্রাহী, সংস্মৃতি, সন্দীপন, অনির্বাণ, এলায়েন্স ও ক্লাব-৭১ এর সার্বিক সহযোগিতা ও স্বেচ্ছাসেবক বৃন্দ প্রস্তুতি সভা সফল আয়োজনে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেন। উল্লেখ্য, আগামী ১৮ অক্টোবর ২০২১ হতে ৫১তম মাহফিল এ সীরতুন্নবী (সঃ) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং ৫ নভেম্বর দিবাগত রাত আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে ইনশাআল্লাহ।
স-িতাজ২৪.কম/এস.টি

১৯ দিনব্যাপী সীরতুন্নবী (সঃ) মাহফিল এর চট্টগ্রাম শহর কেন্দ্রিক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত

themesbazartvsite-01713478536