দুদকের অনুসন্ধানে চেয়ারম্যান তারেকসহ অর্ধশতাধিক দালাল,

দুদকের অনুসন্ধানে চেয়ারম্যান তারেকসহ অর্ধশতাধিক দালাল,

নিজস্ব প্রতিবেদক,

|কক্সবাজার|মহেশখালী|দুদকের অনুসন্ধানে চেয়ারম্যান
তারেকসহ অর্ধশতাধিক দালাল!
কক্সবাজারে বিভিন্ন প্রকল্পসহ মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী,কালারমারছড়া ও হোয়ানকের ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে গিয়ে ৬০ দালালের সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এদের মধ্যে রয়েছেন সাধারণ মানুষের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিক। ইতোমধ্যে এ দালালদের মধ্যে তিনজনের ব্যাংক হিসাব থেকে ২১ কোটি ১ লাখ ৯৫ হাজার ৫৭৭ টাকা জব্দ করেছে দুদক। এরমধ্যে একজন হচ্ছে উপজেলার কালারমারছড়ার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট নোমান শরীফ। এদের মধ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কক্সবাজার শাখা থেকে অ্যাডভোকেট নোমান শরীফের ৪ লাখ ৪৭ হাজার ১৮৭ টাকা। ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার দুদক নোমান শরীফের হিসাব জব্দ করে। মঙ্গলবার দুদকের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচিত সংবাদ প্রকাশিত হলে জেলা জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ফলে নড়ে চড়ে বসেছে দালাল সিন্ডিকেটের বিশাল একটি অংশ।
দুদক সূত্রে জানা যায়, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ-দুর্নীতি চালিয়ে আসছে ৬০ দালালের সিন্ডিকেটসহ মহেশখালীর কালারমারছড়ার চেয়ারম্যান তারেক শরীফ ও তার সহোদর এডভোকেট নোমান শরীফ। সম্প্রতি এসব দালালের সম্পদের অনুসন্ধানও শুরু করেছে দুদক। বর্তমান অনেক বড় উন্নয়ন প্রকল্প চলছে কক্সবাজারে। ৭০টির বেশি প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলছে। এগুলোর জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে ২০ হাজার একরের বেশি জমি। এসব জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে কমিশন বাণিজ্যই ছিল এ দালাল চক্রের মূল কাজ।
দুদক সূত্রে আরও জানা গেছে, কক্সবাজার জেলায় চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম কাজ ভূমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে দালালদের সিন্ডিকেটটি তৈরি হয়েছে। এসব দালাল জমির মালিকদের নাম দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এছাড়া কালারমারছড়ার চেয়ারম্যান তারেক শরীফের আয়ের উৎস গোপনে ও প্রকাশ্য খোঁজ নিলে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন সচেতন মহল। অপরদিকে বিষয়টি নজরে আসার পর দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধানে নামে। শুরুতেই দুদক ও র‌্যাব যৌথ অভিযান চালিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ ওয়াসিম নামের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার এক সার্ভেয়ারকে নগদ ৯৩ লাখ টাকাসহ আটক করে। তার তথ্যের ভিত্তিতে পরে ২২ জুলাই মো. সেলিম উল্লাহ, ৩ আগস্ট মোহাম্মদ কামরুদ্দিন ও সালাহ উদ্দিন নামের তিন দালালকে আটক করে দুদক। আটকের সময় এসব দালালের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকার নগদ চেক ও ভূমি অধিগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ মূল নথি উদ্ধার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যমতে, কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর জাবেদ মো. কায়সার নোবেলের কাছ থেকে ২০ কোটি ৮০ লাখ টাকা জব্দ করা হয়। এর মধ্যে রোববার কক্সবাজার জেলা ডাকঘরে অভিযান চালিয়ে নোবেলের নামে জমা থাকা ৮০ লাখ এবং ১ সেপ্টেম্বর বেসিক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংক কক্সবাজার শাখায় ২০ কোটি টাকা জব্দ করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা র্কাযালয়-২-এর উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি দল অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক ও তাদের অবৈধ অর্থ জব্দ করে। বিষয়টি নিশ্চিত করে দুদক কর্মকর্তা মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। পাশাপাশি চারজন দালালকে গ্রেফতার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নিয়েছি। তিনি বলেন, ‘এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে মূলত ভূমি অফিসের বাইরে এবং ভেতরে বড় ধরনের চক্র আছে। তাদের আমরা চিহ্নিত করেছি। বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের হিসাবে যে লেনদেন তাতে আদৌ কমিশনের টাকা ঢুকেছে কিনা অথবা তাদের হিসাবে থাকা টাকার ব্যাখ্যা কি? এ বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করছি। পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান, তার স্ত্রী এবং ছেলের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ১১টি হিসাব পেয়েছি। এখানে বেশ কিছু টাকাও পাওয়া গেছে। আপাতত লেনদেন স্থগিত রাখার জন্য বলেছি।’ দুদকের অনুসন্ধান ও আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে ৬০ দালালের সন্ধান পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে মহেশখালীর হলেন-
মহেশখালী উপজেলার কালামারছড়ার চেয়ারম্যান তারেক বিন ওসমান শরীফ, তার বড়ভাই অ্যাডভোকেট নোমান শরীফ, কালামারছড়ার জালাল উদ্দিন, নুরুল উসলাম বাহাদুর, জসিম উদ্দিন, জাকারিয়া, নুরুল আমিন, আবদুল গাফ্ফার, মৌলভী জাকারিয়া, হোয়ানকের ছাবের মো. ইব্রাহিম, আমান উল্লাহ, শাপলাপুরের সেলিম উল্লাহ, নুরুল হুদা কাজল, মাতারবাড়ির নাছির উদ্দিন মো. বাবর চৌধুরী, মো. হোসেন, হেলাল উদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান, ধলঘাটার আহমদ উল্লাহ, রেজাউল করিম আশেক, আবদুল্লাহ আল মামুন, আবদুস সাত্তার, মো. মামুন, রেজাউল, ওয়ালিদ চৌধুরী, ধলঘাটার আবু ছৈয়দ, মো. তাজ উদ্দিন, রমজান আলী, মো. হোছন, কামরুল ইসলাম, স্যোশাল ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম।
এদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে দুদক।
এদিকে উল্লিখিতদের পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে এ প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। জানাগেছে, উপজেলার কালারমারছড়া ইউনিয়নের সোনা পাড়া-চিকনি পাড়া থেকে এস পি এম প্রকল্পের পাহাড়ি জমি ধান্য জমি অধিকগ্রহণ করে। যার এলএ শাখার মামলা নং- ০৮/২০১৭-২০১৮ অধিকগ্রহণকৃত জমির অবকাঠামো স্থাপনার জন্য বরাদ্দ পায় ২২ কোটি টাকা। এ বরাদ্দকৃত টাকা পেতে ২২ ধারা নোটিশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তরা অন্যান্য নোটিশ পেলেও অনেকে ২২ ধারা নোটিশ পাননি। অভিযোগ উঠেছে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকের নোটিশ গোপন করে ভূঁয়া অবকাঠামো দেখিয়ে টাকা উত্তোলন, ভূঁয়া পরিচয় পত্র সৃজন, নামে-বেনামে মালিক দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করায় ক্ষতিগ্রস্তরা এলাকায় মানববন্ধনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক অভিযোগ হয়েছে যা বিভিন্ন সময় সংবাদ মাধ্যমে শিরোনামও হয়েছে।

সংবাদ শেয়ার করুন

themesbazartvsite-01713478536